মহাসড়কে পরিবহন শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে জামালপুর-ঢাকা রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তের কারণে চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বৃহস্পতিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই জামালপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগের চিত্র। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত যাত্রী টার্মিনালে পৌঁছে জানতে পারেন যে বাস চলছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাস না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাড়ি ফিরে গেছেন। কেউ কেউ বিকল্প যানবাহনের সন্ধানে দ্বিগবিদিক ছুটোছুটি করছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে তাদের নির্ধারিত যাত্রা ও জরুরি সফর বাতিল করেছেন।
মূলত বুধবার রাতে জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই। জামালপুর-ঢাকা দূরপাল্লার মূল রুটের পাশাপাশি জামালপুর থেকে পরিচালিত অন্যান্য কয়েকটি দূরপাল্লার জেলা রুটেও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তির দৃশ্য চোখে পড়ে।
শ্রমিক দ্বন্দ্বে ভোলায় চলছে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘটশ্রমিক দ্বন্দ্বে ভোলায় চলছে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট
টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়া জামালপুর পৌর শহরের পাথালিয়া ছাতার মোড় এলাকার নিপা আক্তার জানান, তিনি ঢাকা কেরানীগঞ্জে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সকালে বাস টার্মিনালে এসেছিলেন। কিন্তু টার্মিনালে পৌঁছে শোনেন বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। এখন কীভাবে তিনি গন্তব্যে পৌঁছাবেন, তা নিয়ে চরম চিন্তায় পড়ে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে নিপা আক্তার বলেন, ‘বাস বন্ধের বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। পরিবহন বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত আগে থেকেই সাধারণ মানুষকে জানানো উচিত ছিল। তাহলে আমাদের এভাবে রাস্তায় এসে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।’
একইভাবে ভোরে নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে বাস টার্মিনালে এসেছিলেন ঢাকাগামী যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম। একটি অত্যন্ত জরুরি কাজে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যাওয়ার জন্য খুব ভোরে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু টার্মিনালে এসে শুনছি কোনো বাস চলবে না। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়া এভাবে হঠাৎ বাস বন্ধ করে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি আগে থেকে জানা থাকলে বিকল্প কোনো উপায়ে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতাম।’

এদিকে বগুড়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে টার্মিনালে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষারত এক যাত্রী হতাশ হয়ে বলেন, ‘হঠাৎ করেই বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা আমরা সাধারণ যাত্রীরা জানতাম না। সকালে টার্মিনালে আসার পর বিষয়টি জানতে পারি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখি, গাড়ি যদি না ছাড়ে তবে বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’
টার্মিনালে ঘণ্টাব্যাপী অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রী তীব্র অভিযোগ তুলে বলেন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ বা পেশাগত সমস্যা থাকতেই পারে, কিন্তু সেটির খেসারত কেন বারবার সাধারণ জনগণকে দিতে হবে? কোনো প্রকার আগাম নোটিশ ছাড়া হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে বের হওয়া রোগী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার চাকরিজীবীরা।
পরিবহন ধর্মঘটের মূল নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, বুধবার সকালে জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা বাজার এলাকায় রাজীব পরিবহনের দুটি বাসে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সে সময় বাসের চালক ও সহকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের মারধর করা হয়। এই অপ্রীতিকর ঘটনার প্রতিবাদেই বুধবার রাতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেয়।
ঘটনাবলির সত্যতা নিশ্চিত করে জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ জানান, জামালপুরগামী এবং ঢাকাগামী রাজীব পরিবহনের দুটি বাসে অতর্কিত ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বাসের চালক ও সহকারীদের মারাত্মকভাবে মারধর করে তাদের কাছে থাকা টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
তিনি আরও বলেন, এই সহিংসতার খবর দ্রুত পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে সবাই মিলে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেন। মহাসড়কে চালক ও শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই রুটে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে বাসে হামলা, ভাঙচুর এবং শ্রমিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।


















