ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ন

ইরানি রিয়ালের মানে সর্বনিম্ন পতন, প্রায় ২ কোটিতে মেলে ১ কেজি মাংস

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ধাক্কায় ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান। সম্প্রতি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণার পরপরই দেশটির মুক্তবাজারে এই ধস নামে। বর্তমানে ইরানের উন্মুক্ত বাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ ২১ হাজার ৯৫০ রিয়ালে।

দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই চাপে রয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ দেশটির ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তেহরানের বাজারে খাদ্য, পোশাক ও ওষুধের দাম যুদ্ধের আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করে দেখেছে-মাত্র ছয় মাসে অনেক নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং প্রায় ১ লিটার রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই অর্থে তার অর্ধেকেরও কম পণ্য পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ওষুধের দাম। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিনের দাম ৬৪২ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া রান্নার তেলের দাম ১৭৭ শতাংশ, মুরগির মাংস ৭৪ শতাংশ এবং টমেটো ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুদ্ধের আগে এক কেজি টমেটোর দাম ছিল ৯ লাখ ৪০ হাজার, এখন তা ১৬ লাখ ১০ হাজার রিয়াল। কমলার কেজি যুদ্ধের আগে ছিল ১১ লাখ ১৭ হাজার রিয়াল, এখন ২৩ লাখ। যুদ্ধের আগে প্রতি কেজি শসার ছিল ৬ লাখ ৭০ হাজার, এখন সেটা ১০ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল।

প্রতি কেজি চালের দাম ছিল ৫৩ লাখ, যুদ্ধ শুরুর পর তা হয়েছে ৫৪ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক লিটার রান্নার তেলের দাম ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার, এখন সেটা ৬৮ লাখ। এক সময় ডিমের ডজন ছিল ২৮ লাখ, এখন তা ৬৪ লাখ রিয়াল। চিনির কেজি ছিল ৯ লাখ ২০ হাজার, এখন অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর সেটা ১১ লাখ ১৫ হাজার রিয়াল।

গরুর মাংসের কেজি ছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ, এখন তা বেড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক কেজি মুরগির মাংসের দাম ছিল ৪২ লাখ, এখন সেটা ৭৩ লাখ। বিভিন্ন ধরনের শিশু খাদ্যের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৮২ লাখ, যুদ্ধ শুরুর পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক পাতা প্যারাসিটামলের দাম ছিল ১৪ লাখ, এখন সেটা ২৭ লাখ রিয়াল। ইনসুলিনের দাম ছিল ১২ লাখ, এখন তা ৮৯ লাখ। সাধারণ একটা শার্টের দাম ছিল ৪৫ লাখ, যুদ্ধের পর তার দাম এখন ৮০ লাখ রিয়াল।

তেহরানের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী আফসানেহ এক বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীসহ বসবাস করেন। তিনি বলেন, তাদের যা আয় সেটা দিয়ে যুদ্ধের আগে পরিবারের তিন বা ছয় মাসের বাজার হতো। কিন্তু এখন সেই আয় দিয়ে এক মাসই সংসার চালানো দায়।

আফসানেহ জানান, তাদের সাপ্তাহিক বাজারের খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে শিশুর দেখাশোনার ব্যয় থেকে। একটি ডে-কেয়ার কেন্দ্রে প্রতিদিন শিশুকে রাখার খরচ এখন প্রায় ৫ লাখ তোমান (৫০ লাখ রিয়াল বা প্রায় আড়াই ডলার), যা তাঁদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, ইরানের সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন লেনদেনে ‘তোমান’ ব্যবহার করেন, যা ১০ রিয়ালের সমান। বড় অঙ্কের রিয়ালের হিসাব সহজ করতে এই এককটি বেশি প্রচলিত।

আফসানেহ বলেন, সরকার শিশু খাদ্যে ভর্তুকি দিলেও মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি-সম্পূরক ওষুধ বিমার আওতায় নেই। ফলে সন্তানের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নতুন কাপড় কেনা, গাড়ি বদলানো—এসব পরিকল্পনা বাদ দিয়েছি। এখন শুধু খাবার আর প্রয়োজনীয় খরচ চালিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।’

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ