ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

‘ইরানের ধৈর্যেরও সীমা আছে’

লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন এবং ইরানের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবৈধ অবরোধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তেল আবিব ও ওয়াশিংটনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘ইরানের ধৈর্যেরও একটা নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।’

অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়া নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বিন্দুমাত্র কোনো উদ্বেগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাগজে-কলমে বৈশ্বিক কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকার কথা বলা হলেও, শীর্ষ দুই দেশের এমন অনমনীয় অবস্থানে মাঠপর্যায়ে সংঘাতের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ও সামুদ্রিক বাণিজ্য অবরুদ্ধ করার প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি বিশেষ পোস্ট দিয়েছেন ইরানের নীতি নির্ধারক মোহসেন রেজায়ি। তিনি স্পষ্ট জানান, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সামুদ্রিক অবরোধের ধারাবাহিকতা কিংবা লেবানন সীমান্তে নতুন করে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনোভাবেই মেনে নেবে না ইরান।

এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকে এক সামুদ্রিক বিজ্ঞপ্তিতে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী যেকোনো বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন সামরিক যুদ্ধজাহাজকে অবশ্যই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নতুন নৌ নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, অন্যথায় সেগুলোকে সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

এদিকে এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, এই আলোচনা শেষ হয়ে বা বন্ধ হয়ে গেলেও তার ব্যক্তিগতভাবে কিছুই আসে যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে তিনি মোটেও ভাবছেন না দাবি করে ট্রাম্প দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি নীতির কারণে অদূর ভবিষ্যতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা কূটনৈতিক সমঝোতার সব পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই দেশের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত বিন্দুমাত্র কমেনি। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের গোরুক শহর এবং কেশম দ্বীপের সামরিক রাডার ও ড্রোন স্থাপনায় মার্কিন নৌবাহিনীর বিমান হামলার সুনির্দিষ্ট খবর মিলেছে।

এই হামলার তীব্র জবাবে ইরানের বিশেষ বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত এমন একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে সফলভাবে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যেখান থেকে ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালানো হয়েছিল। ফলে দুই পরাশক্তির এই ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

আপাতত পুরো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে হরমুজ প্রণালী ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ। একদিকে হরমুজে বিদেশি জাহাজের ওপর কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে ইরান, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে চারমুখী নৌ অবরোধ পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলেছে।

এর মাঝেই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে যেকোনো টেকসই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বনেতাদের আরও গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার প্রয়োজন হবে।

সূত্র: আল জাজিরা

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ