ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫:২০ পূর্বাহ্ন

‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ খ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতির কাছ থেকে চিরবিদায় নিচ্ছেন

খালেদা জিয়া, ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে খ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আজ জানাজা ও দাফন কার্য সম্পন্নের মধ্য দিয়ে জাতির কাছ থেকে চিরবিদায় নিচ্ছেন। এ উপলক্ষে যে অভূতপূর্ব জনসমাগম ঘটেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ও নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন, যা নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।

এর আগে ইতিহাসে এমন বিশাল জনসমাগম দেখা গিয়েছিল ৪৪ বছর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তার জানাজায় এবং ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান সমন্বয়কারী ওসমান হাদীর জানাজায়। তবে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ছিল মাত্রার দিক থেকে আরও ব্যাপক, মর্যাদার দিক থেকে রাজসিক এবং তাৎপর্যের দিক থেকে ঐতিহাসিক। হয়তো এই অভূতপূর্ব ঘটনার পূর্ণ মূল্যায়ন আমরা আগামী দু–এক দিনের মধ্যেই আরও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারব। নিঃসন্দেহে এসব স্মৃতি জাতির ইতিহাসে গভীরভাবে অম্লান হয়ে থাকবে।

খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় একজন জাতীয় নেতার সম্মানে বিদায় জানানো এবং জনগণের এই বিপুল উপস্থিতির পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং সর্বোপরি তার ব্যতিক্রমী মানবিক গুণাবলী। তিনি ছিলেন আপসহীন ও দৃঢ়চেতা, অথচ একই সঙ্গে অসাধারণভাবে সহনশীল ও ধৈর্যশীল, যা তাকে চরম সংকটের মধ্যেও মর্যাদাশীল অবস্থানে স্থির থাকতে সহায়তা করেছে। ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেও তার আচরণে ছিল শালীনতা, ভদ্রতা, নম্রতা ও সৌজন্যবোধ; এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তিনি সম্মান প্রদর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ তাকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে এনে একটি সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের দূরদর্শী, উদার ও পরিপক্ব মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবেই এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান সম্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে একজন জাতীয় নেতাকে তার প্রাপ্য সম্মান জানানো রাষ্ট্রের পরিণত বোধ, উদারতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যথায়, এমন সংবেদনশীল সময়ে সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা সহজ হতো না।

এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং জনগণের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক জনসমাগম, উভয়ই ছিল খালেদা জিয়ার জীবন, আদর্শ ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতি সম্মিলিত স্বীকৃতি। তিনি কেবল একজন ক্ষমতাসীন রাজনীতিক নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয়, ব্যতিক্রমী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক, যার প্রতি মানুষের ভালোবাসা তার বিদায়লগ্নেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

খালেদা জিয়ার এই রাজসিক বিদায় আসলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেরই প্রতিফলন, যেখানে ক্ষমতার চেয়েও মূল্য পেয়েছে চরিত্র, সৌজন্য ও মানবিকতা। তার সহনশীলতা, ধৈর্য, শালীন আচরণ, প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক চর্চায় রূপ দিয়েছিল। এসব গুণই তার বিদায়কে সাধারণ বিদায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ও মহিমান্বিত অধ্যায়ে উন্নীত করেছে।

আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, যদি আগামী দিনের রাজনীতিবিদরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দর্শন, ব্যক্তিত্বের ভারসাম্য ও আচরণগত শালীনতা অনুসরণ করেন, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসা অসম্ভব নয়। ব্যক্তি আক্রমণ, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে সহনশীলতা, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও অর্থবহ করে তুলতে পারে। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া কেবল অতীতের একজন নেতা নন, বরং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ডাক্তার সাগর খান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ