বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও এক মাস সময় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রোববার (১৫ জুন) বিচারপতি মুজাহিদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এতে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী খোঁজা ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বেশ কিছু প্রযুক্তিগত তদন্তের কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এজন্য আরও সময় প্রার্থনা করা হয়। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করে।
এর আগে সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তাবেষ্টিত পরিবেশে হাজির করা হয় মামলার চার আসামিকে। তারা হলেন—
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ড. শরিফুল ইসলাম,
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন,
সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়,

ও রংপুর জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় চার আসামি ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম আসতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম তদন্তে উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া ও সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হন রংপুর শহরের পার্ক মোড়ে। ঘটনার সময় তিনি নিরস্ত্র ছিলেন এবং একদল শিক্ষার্থী নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ পুলিশ বাহিনী এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় প্রমাণ মেলে যে, গুলিবর্ষণকারী ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের উপস্থিতিতেই ঘটনাটি ঘটে।
ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। সামাজিক মাধ্যমে ‘#JusticeForSayeed’ ট্রেন্ডে পরিণত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন গতি পায়, যার ধারাবাহিকতায় ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়।
আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অব্যাহত জনচাপ, গণবিক্ষোভ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে পরিস্থিতি অস্থির হয়ে পড়ে। অবশেষে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।
আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড যে কতটা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলাটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, দায়িত্বে থেকে নিরীহ নাগরিক হত্যা, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার সংক্রান্ত ধারায় তদন্ত চলছে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এরপর শুনানির ভিত্তিতে আদালত অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি সংকলনের কাজ প্রায় শেষের পথে।
মামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডে রূপ নেওয়া বিরল কিছু ঘটনার একটি। ট্রাইব্যুনালের সক্রিয় পদক্ষেপ এবং সামাজিক চাপের মুখে এ মামলার গতি আগের তুলনায় অনেক বেশি। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নির্ভর করছে এমন কিছু মামলার ন্যায্য নিষ্পত্তির ওপর।


















