যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থার নতুন ক্ষেত্র বা ফ্রন্ট হিসেবে আলোচনায় এসেছে তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা নিম্নকক্ষের স্পিকার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি, ন্যান্সি পেলোসির সফরকে ঘিরে ফের দুই পরাশক্তির মুখোমুখি অবস্থান লক্ষণীয়। আর এ অবস্থায় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রযুক্তিগতভাবে প্রাগ্রসর দেশটি।
সপ্তাহখানেক আগে থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়টি নিয়ে বেশ সরগরম। আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানার আগেই গণমাধ্যমে শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নকক্ষের স্পিকার পেলোসি তাইওয়ান সফর করবেন। এরপরই এ নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি দেয়। সফরের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সাম্প্রতিক ফোনালাপে সফরের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে জিন পিং ‘আগুন নিয়ে খেললে নিজেকেই পুড়তে হবে’ বলে হুমকি দিয়েছেন, যা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
চীনা হুমকি যেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সফরটি আরও আবশ্যক করে দিয়েছিল। গত ৬ আগস্ট এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে সফরের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন ন্যান্সি পেলোসি। এসব দেশের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ছিল। এবং এর মধ্যেই তিনি তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে সফর করেন, যদিও সেটি তার সফরসূচিতে উল্লেখ ছিল না। উল্লেখ্য, গত ২৫ বছরের মধ্যে স্বশাসিত দ্বীপটিতে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো মার্কিন কর্মকর্তার সফর।
অবশ্য শুরু থেকেই তাইওয়ান এ সফর প্রসঙ্গে নীরব ছিল। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন কয়েক দিন আগে শুধু জানিয়েছিলেন, ‘গত কয়েক বছরে তাইওয়ানের পক্ষে পেলোসির দৃঢ় সমর্থন থাকায় তিনি কৃতজ্ঞ। তাছাড়া বিদেশি কোনো অতিথিকে তাইওয়ান সব সময় স্বাগত জানায়।’ এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন বিশ্লেষকের বরাতে বিবিসিসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান কৌশলগত কারণেই অতি উৎসাহ প্রকাশ করেনি। কেননা তারা পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতির দায় থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে চেয়েছে।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, একজন মার্কিন কর্মকর্তার তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে চীনা কর্তৃপক্ষের এত প্রতিক্রিয়ার পেছনের কারণ। তাইওয়ান মূলত দক্ষিণ চীন সাগরের তীরবর্তী একটি দ্বীপাঞ্চল, যা মূল চীনা ভূখণ্ড থেকে ১৮০ কিলোমিটার প্রশস্ত তাইওয়ান প্রণালির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। ১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মূল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন পিপলস রিপাবলিক অব চীন (পিআরসি) প্রতিষ্ঠা করে তখন কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধীরা তাইওয়ান প্রণালির অপর প্রান্তে তাইওয়ানে অবস্থান নেয়। এবং তারা ১৯১১ সালে জাপানের বিরুদ্ধে চীনের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে রিপাবলিক অব চীন (আরওসি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে নামে তাওয়ান দ্বীপে আলাদাভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছে। সে থেকেই তাইওয়ানের দাপ্তরিক নাম রিপাবলিক অব চীন। তবে বরাবরই চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানকে নিজেদের অঞ্চল মনে করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সরকার বরাবরই দাবি করে তাইওয়ানই ১৯৪৫ সালের জাপানের পরাজয় চুক্তির দাবিদার। এই সংকটের কারণেই তাইওয়ান সবসময় মনে করে চীন জোরপূর্বক তাইওয়ান দখল করার জন্য আক্রমণ করতে পারে। এজন্য নিজেদের রক্ষায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। এদিকে পশ্চিমা উদার অর্থনীতির অনুসারী হওয়ায় এ দ্বীপাঞ্চলটি বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিপুল শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। ফলে সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি তাইওয়ানও এশিয়ার অর্থনীতির জন্য ‘টাইগার’ খ্যাতি পেয়ে যায়।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তার তাইওয়ান সফরকে চীন তার নিজস্ব অঞ্চলে ‘অন্যায্য’ হস্তক্ষেপ বলে মনে করে। এতে তারা চীনের ‘সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার’ উপর হুমকি বলে বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের নাকের ডগায় আস্থাভাজন সহযোগী হিসেবে তাইওয়ানকে মনে করে। তাইপেতে অবতরণের পরই পেলোসি এক টুইট বার্তায় লিখেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সফর তাইওয়ানের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রকে সমর্থন করার জন্য। তাইওয়ানের দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষের সঙ্গে আমেরিকার সংহতি আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এ সফর কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী নীতির বিরোধিতা করে না। তাইওয়ান অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাসকো) পরিবর্তনের জন্য (চীনের) একতরফা প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে।’ উল্লেখ্য, এর আগে ট্রাম্প সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তাইওয়ান সফর করেছিলেন। কিন্তু পেলোসির সফর বাড়তি গুরুত্ব বহন করে, কেননা তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং বরাবরই চীনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। এছাড়া এমন একটা সময়ে তিনি চীনের আশেপাশে সফর করছেন যখন চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কাউন্সিল হবে এবং সেখানে শি জিন পিং তৃতীয় মেয়াদে দলের প্রধানের ক্ষমতার জন্য অনুমোদন চাইবেন। এ অবস্থায় মার্কিন কর্মকর্তাদের চীনের আশেপাশে সফর করাকে চীনা সরকারের শীর্ষব্যক্তিরা অস্বস্তিকর হিসেবে দেখছেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
তাছাড়া তাইওয়ান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর সরবরাহকারী। এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইলেক্ট্রনিক্স চিপ সরবরাহ হয়। ফলে তাইওয়ানের অর্থনীতির উপর প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল বিশ্বব্যবস্থার বড় নির্ভরশীলতা রয়েছে। এ অবস্থায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে তাইওয়ানে কোনো নতুন যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হলে তা বিশ্বকে একটি অভাবনীয় সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। পেলোসির সফরের প্রতিক্রিয়ায় চীনা সরকার কেবল হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। সফর চলাকালেই তাইওয়ান প্রণালির পার্শ্ববর্তী এলাকায় গুলি ছোড়ার প্রশিক্ষণ ও চার দিনব্যাপী সামরিক মহড়া দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন বলছে, পেলোসির ফ্লাইট তাইওয়ানে অবতরণের চেষ্টা হলে তাতে গুলি করা হবে জানিয়েছিল চীন। গুলি ছোড়ার প্রশিক্ষণ সে প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া সফরের ঠিক আগে তাইওয়ান থেকে চীনা মূল ভূখণ্ডকে বিভক্তকারী সমুদ্রসীমায় যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে চীন। এবং সে মহড়ার ভিডিও প্রচার করে বলেছে, তারা যে কোনো ঘটনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এছাড়া তাইওয়ানের শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে চীনে খাদ্যপণ্যের সরবরাহের চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে খবরে জানা গেছে। এ অবস্থায় আরও কঠোর কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ চীনের তরফে নেওয়া হতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে। অবশ্য তাইওয়ানের অর্থমন্ত্রী সর্বশেষ ৮ আগস্ট গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের বিপুল বাণিজ্যিক লেনদেন রয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে। এবং বাণিজ্য বিগত কয়েক মাসে প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী তাইওয়ান থেকে চীনে মাসে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় ২৪ বিলিয়নের মতো। এ অবস্থায় পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে কোনো কঠোর অবরোধ আরোপিত হলে তা তাইওয়ানকে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা পুষিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা সে চিন্তাও সামনে আসছে।
তাইওয়ান নিয়ে চীনের বক্তব্য-বিবৃতি, গতিবিধি নিয়ে বাইডেন প্রশাসন বেশ কিছু দিন ধরেই উদ্বিগ্ন। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংস্থার অনেকেই মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে চীন হয়তো তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার আগেই ওই দ্বীপকে জোর করে অঙ্গীভূত করে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। উদ্বেগ রয়েছে যে, চীনারা হয়তো যে কোনো সময় তাইওয়ান প্রণালির পুরোটা অংশে অথবা অংশবিশেষে বাকিদের চলাচল বন্ধ করে দেবে। গত জুন মাসেই চীন বলেছে, তাইওয়ান প্রণালিতে একমাত্র তাদেরই সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা অর্থনীতির করুণ দশাকে সামনে রেখে এ পরিস্থিতিতে নতুন করে তাইওয়ানে আরেকটি যুদ্ধাবস্থা ও সামরিক উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।


















