ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:৫১ অপরাহ্ন

১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশ, সরেজমিনে যা পেল দুদক

টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগের ঘটনায় এবার অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের একটি দল সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন। এ সময় জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. বাসেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, সেতুটিতে দুদকের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হয়েছে। ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে পরীক্ষা করে রডের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, সরেজমিনে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুদকের বিশেষজ্ঞরা সরেজমিন প্রতিবেদন দেবেন। সেখানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশনকে বিস্তারিত জানানো হবে। এরপর কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবহৃত বাঁশগুলো সরেজমিনে তারা দেখতে পাননি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে সাটারিংয়ে বাঁশের ব্যবহার দেখা গেছে।

এর আগে, মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এ ঘটনায় বাসাইল থানায় মামলা হওয়ার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার শাহ আলমের বয়স ৪৪ বছর। তিনি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে।

ঘটনার তদন্তে উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন।

একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি অফিস আদেশ ও চিঠির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম এবং অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম।

এদিকে সেতুটি পরিদর্শন করেছেন এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।

ব্রিজে রডের বদলে বাঁশ!ব্রিজে রডের বদলে বাঁশ!
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলম তাদের অনুপস্থিতিতে রাতে কাউকে না জানিয়ে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টি ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কে ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজ করছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ২০ শতাংশ কাজ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা মোবাইল ফোনে কাজটির ভিডিও ধারণ করেন।

স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবার রাতে কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ