ঢাকা, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে পাল্টা শুল্ক দিচ্ছে কানাডা

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কের জবাবে এবার একই পথে হাঁটছে কানাডা। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যে পাল্টা শুল্ক বসাবে দেশটি। এতে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। ওয়াশিংটন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানোর পর এই সিদ্ধান্ত নিল অটোয়া। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। খবর আলজাজিরার।

শনিবার (২২ আগস্ট) অটোয়ায় সাংবাদিকদের কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে কানাডা। এর মাধ্যমে কানাডার শ্রমিক, কৃষক, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

নতুন কানাডীয় শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য থাকবে। এ ছাড়া আগে কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে পণ্যগুলোতে শুল্ক আরোপ করেছিল, সেগুলোর কিছু পণ্যও নতুন করে পাল্টা শুল্কের আওতায় আসবে।

কার্নি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টা শুল্কের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডীয় শিল্পগুলোর জন্য আগামী সপ্তাহে সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এসব সহায়তা কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে বলেও জানান তিনি।

বিরল খনিজ নিয়ে কেন চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধবিরল খনিজ নিয়ে কেন চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র বাণিজ্য আলোচনা শুক্রবার রাতে ভেস্তে যায়। এর পরই দুই দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক অংশীদার ও মিত্র দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কে কানাডার ওয়াইন, আসবাব, দুগ্ধপণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার ছিপ ও হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য পড়েছে। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

কার্নি বলেন, শুরুতে আলোচনা ইতিবাচক থাকলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কিছু শর্ত দেন, যা কানাডার জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন শর্তগুলো অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও অন্যায্য ছিল। এগুলো কানাডার জন্য চুক্তির প্রকৃত সুবিধাকে দুর্বল করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য দেশের সঙ্গে কানাডার নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

কার্নি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা কানাডা গ্রহণ করতে পারবে না। এমনকি ওয়াশিংটন যে দাবি করেছে, সেটিও মেনে নেওয়া হবে না।

এ ছাড়া মার্কিন আলোচকেরা কানাডার ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েও ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন কার্নি।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া বিশ্বনেতাদের মধ্যে কার্নি অন্যতম। একই সঙ্গে তিনি নতুন বাণিজ্য ও সামরিক জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে কানাডার রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় দেশটির অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতিটি বেশ কঠিন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শনিবার ফক্স নিউজকে বলেছেন, কানাডার পাল্টা শুল্কের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। কানাডার সঙ্গে নতুন করে কোনো আলোচনা আপাতত পরিকল্পনায় নেই বলেও জানান তিনি।

গ্রিয়ার দাবি করেন, কানাডা সব সময় সবচেয়ে ভালো বাণিজ্যচুক্তির সুযোগ পেয়েছে। এবারও আরও ভালো চুক্তির সুযোগ ছিল, কিন্তু কানাডা সেটি গ্রহণ করতে চায়নি।

নতুন মার্কিন শুল্ক কানাডার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদক ডেভিড মার্সার কানাডার ক্যালগারি থেকে জানান, এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেকারত্বও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর কিছু প্রতিষ্ঠানকে শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতিতেও পড়তে হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে একই সময়ে কার্নি এই বাণিজ্যসংঘাতকে কানাডার জন্য নতুন সুযোগ হিসেবেও তুলে ধরছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে কানাডা।

মার্সার জানান, কার্নি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করছেন। কানাডার অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করাই এর লক্ষ্য।

কানাডায় সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় কঠোর অবস্থানের প্রতি জনসমর্থনের চিত্র পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে লেজারের এক জরিপে ৫৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং আর কোনো ছাড় না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের অন্যতম সোচ্চার বিরোধী অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ড কার্নির পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।

শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কার্নি ওই চুক্তিতে সই না করায় তিনি খুশি। তার মতে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি অন্টারিও, গাড়ি শিল্প, ইস্পাত খাত ও উৎপাদনশিল্পের জন্য খারাপ ছিল।

অন্টারিওর পোর্ট কলবোর্নের বাসিন্দা স্টুয়ার্ট এডওয়ার্ডস বলেন, এই বাণিজ্যযুদ্ধ সবার ওপরই প্রভাব ফেলবে এবং বিষয়টি দুঃখজনক। ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কানাডা এবার তা মেনে নেবে না এবং পাল্টা লড়াই করবে।

অন্যদিকে কানাডার ফোর্ট এরির বাসিন্দা পামেলা কুলিস পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার আশঙ্কা, জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। খাদ্য, কাঠসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডায়মন্ড ইসিঙ্গারও মনে করেন, এই বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই ক্ষতির মুখে পড়বে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপ এবং কানাডার পাল্টা ব্যবস্থার কারণে উভয় দেশের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য চাপ ও সংকট তৈরি হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়াই বাস্তবসম্মত পথ ছিল বলে তিনি মনে করেন।

ইসিঙ্গার বলেন, শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেই কানাডার মতো কোনো দেশের পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন প্রশাসন সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয়। তাই ৫০ শতাংশ শুল্ক মেনে নিয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। কানাডাকে নিজেদের পাল্টা ব্যবস্থা নিতেই হতো।

বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী মিনেসোটা, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের গভর্নররাও ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন।

তাদের অভিযোগ, মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধে জড়িয়ে ট্রাম্প এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও সাধারণ পরিবারের খরচ বেড়ে যাবে।

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হকুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, মিত্রদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ তৈরি করা এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের দাম বাড়ানোই ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির মূল চিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২০০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বিজনেস রাউন্ডটেবলও নতুন শুল্ক নিয়ে সতর্ক করেছে। সংগঠনটি বলেছে, নতুন শুল্কের কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর খরচ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

একই সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও বাড়ানোর বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—দুই সরকারকেই আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ