বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, সৃজনশীলতা, পাঠাভ্যাস, নবীন লেখক তৈরি এবং সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’ আয়োজন করেছে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-এর প্রথম বার্ষিক সাহিত্য উৎসব ২০২৬। শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বিল্ডিংয়ে অবস্থিত অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন হলে দিনব্যাপী এ সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষক তারিক মনজুর, এটিএন বাংলার এডিশনাল ভাইস প্রেসিডেন্ট সেলিম দৌলা খান, বিশিষ্ট সাহিত্যিক অমল সাহা, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক ড. মো. নাছিম আখতার, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অধ্যাপক সামসাদ ফেরদৌসী, কবি রমজান মাহমুদ এবং শামীম নূর মুন্নি। উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ জসিম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডা. সাগর খান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, কবি ও সাহিত্যিকদের বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের লেখা বেশি করে পড়তে হবে। কবি তাঁর অনুভূতি ও সমকালীন বিষয়গুলো সাহিত্যে তুলে ধরেন, যা মানুষের মননশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আল মাহমুদসহ দেশের বিভিন্ন বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকের লেখা পড়া এবং তাঁদের সাহিত্য থেকে শিক্ষা নিয়ে তা জাতীয় জীবনে প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং সংগঠনটির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন।
বিশেষ অতিথি তারিক মনজুর সাহিত্য ও সাহিত্য সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, সাহিত্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের মননশীলতার বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। কবি ও সাহিত্যিকদের কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তিনি ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন।
বিশেষ অতিথি সামসাদ ফেরদৌসী পাঠকের কাছে কবিতা ও সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকী, সাহিত্য সংগঠন, সম্পাদক, প্রকাশক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমকে সাহিত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

কবি রমজান মাহমুদ বলেন, লিখতে হলে প্রচুর অনুশীলন করতে হবে। লেখালেখি একটি নিরন্তর সাধনার বিষয়। পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকরণ সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা জরুরি।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক অমল সাহা বলেন, প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তি আসবেই। তবে প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে সাহিত্যকে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে বই বিক্রির পরিমাণ এখনো আশানুরূপ নয়, তবে এটি সময়ের ব্যাপার। প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে আমরাও সাহিত্যকে আরও এগিয়ে নিতে পারব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষ অতিথি শামীম নূর মুন্নি বলেন, বর্তমান সময়ে সাহিত্য অনেকটাই অবহেলিত এবং সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতাও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। জমজমাট সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়ে সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে দায়িত্ব নিয়ে এ ধরনের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি ‘হৃদয়ে ৮৮’ এবং এর সাহিত্যভিত্তিক সংগঠন ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-কে অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-এর কৌশলগত রূপরেখা (Strategic Framework) উপস্থাপন করা হয়। এতে সংগঠনের ভিশন, মিশন, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মূল কর্ম-কৌশল, সাংগঠনিক কাঠামো, পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. সাগর খান বলেন, “হৃদয়ে সাহিত্য কেবল একটি সাহিত্য সংগঠন নয়; এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সাহিত্য আন্দোলন।” তিনি বলেন, মানসম্মত সাহিত্যচর্চা, নবীন লেখক তৈরি, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, প্রকাশনা, গবেষণা, ডকুমেন্টেশন এবং শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সাহিত্যের গুণগত মান উন্নয়নে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’ কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, প্রকাশক ও সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সাহিত্যচর্চাকে এগিয়ে নেওয়া হবে। সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে সাহিত্য উৎসব, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির মাধ্যমে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-কে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই সাহিত্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সভাপতি অনুষ্ঠানের আয়োজনের ক্ষেত্রে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক জুয়েল হাজারী, যুগ্ম আহ্বায়ক শাহনেওয়াজ কবির ইমন এবং যুগ্ম সম্পাদক সুচিত্রা মিলি-এর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পুরো অনুষ্ঠান আয়োজন এবং স্যুভেনির প্রণয়নে তাঁরা অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি সাহিত্যকে মানুষের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে প্রতিবছর এ ধরনের সাহিত্য উৎসব আয়োজন, স্মরণিকা প্রকাশ এবং একটি টেকসই ও শক্তিশালী সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দিনব্যাপী উৎসবে কবিতা পাঠ, গল্প পাঠ, সাহিত্য আলোচনা, সম্মাননা প্রদান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লেখক-পাঠক মতবিনিময়সহ বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, সম্পাদক, প্রকাশক, পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
আয়োজকরা জানান, ‘হৃদয়ে সাহিত্য’ ভবিষ্যতে নিয়মিত সাহিত্যসভা, পাঠচক্র, সৃজনশীল লেখালেখির কর্মশালা, সম্পাদকীয় প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা, সাহিত্য উৎসব এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাহিত্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
উৎসবের সার্বিক আয়োজন করে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’, যা ‘হৃদয়ে ৮৮’-এর সাহিত্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল এটিএন বাংলা ও দৈনিক মানবকণ্ঠ।


















