ভারতের উত্তরপ্রদেশজুড়ে ভয়াবহ ঝড়, বজ্রপাত ও অকাল ভারি বৃষ্টিতে অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রয়াগরাজ, ভাদোহি, ফতেহপুর ও প্রতাপগড় জেলায়।
বুধবার রাতভর চলা এই দুর্যোগে বহু গাছ উপড়ে পড়ে, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যায় এবং শত শত কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্যোগের পরপরই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পরিস্থিতির বিষয়ে জরুরি বৈঠক করেন এবং জেলা প্রশাসনকে দ্রুত ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে সহায়তা পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রয়াগরাজে ১৭ জন, ভাদোহিতে ১৬ জন, ফতেহপুরে ৯ জন, বদাউন জেলায় ৫ জন এবং প্রতাপগড়ে ৪ জন মারা গেছেন। এছাড়া চন্দৌলি ও কুশীনগরে দুজন করে এবং সোনভদ্র জেলায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কানপুর দেহাত ও দেওরিয়াতেও পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
প্রয়াগরাজ জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে হান্ডিয়া এলাকায়। সেখানে সাতজন মারা যান। ফুলপুরে চারজন, সোরাঁওয়ে তিনজন, মেজায় দুজন এবং সদর এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ গাছচাপা পড়ে, দেয়াল ধসে অথবা বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ভাদোহি জেলায় ঝড়ের তাণ্ডব ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রবল বাতাসে অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ে এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে যায়। এতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহু এলাকায়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কুনওয়ার বীরেন্দ্র কুমার মৌর্য বলেন, ঝড়ে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফতেহপুরে নিহত হয়েছেন ৯ জন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, খাগা তহসিলে আটজন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচ নারী। সদর তহসিলে একটি বাড়ির দেয়াল ধসে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অবিনাশ ত্রিপাঠী বলেন, দুর্যোগের পর চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তা জোরদার করা হয়েছে।
প্রতাপগড়ে প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে দেয়াল ও সিমেন্টের ছাউনি ধসে চারজনের মৃত্যু হয়। পুলিশ সুপার দীপক ভুখার জানিয়েছেন, লালগঞ্জ এলাকার ওঝা কা পুরওয়া গ্রামে একটি সিমেন্টের ছাউনি ধসে ভীম যাদব নামে ২৫ বছর বয়সি এক যুবকের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বাগরাই থানার সারি স্বামী গ্রামে দেয়ালচাপা পড়ে মারা যান ভুষণ পান্ডে নামের ৫৬ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। এছাড়া বজ্রপাত ও ঝড়সংক্রান্ত পৃথক ঘটনায় আরও দুজন প্রাণ হারান। কানপুর দেহাতে বজ্রপাতে এক কিশোরীর মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৯ বছর বয়সি রুচি নামের ওই তরুণী প্রবল বৃষ্টির সময় ছাগল নিয়ে একটি নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। কয়েকটি ছাগলও মারা যায়। পাশে থাকা ৬০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। দেওরিয়া জেলায়ও বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ভীমপুর গৌরা গ্রামের বাসিন্দা কোমল যাদব এবং নেরুয়ারি গ্রামের রামনাথ প্রসাদ বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
সোনভদ্র জেলায় ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যান মাধব সিং নামের ৩৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।
এই দুর্যোগের কারণে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বহু গ্রামে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে, রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে উপড়ে পড়া গাছের কারণে। কৃষিক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গম ও সবজির খেতে পানি জমে ফসল নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি রাজ্যের রাজস্ব ও কৃষি বিভাগকে দ্রুত ক্ষতির জরিপ চালাতে বলা হয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুমের এই সময়ে উত্তর ভারতে এমন প্রবল ঝড় ও বজ্রপাত অস্বাভাবিক। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং খোলা জায়গা ও গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।


















