ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২:২৫ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিক, বিস্ফোরণ ও দূষণের শঙ্কা

চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব রাসায়নিক দ্রুত নিরাপদে অপসারণ ও নিষ্পত্তি করা জরুরি।

২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অনিরাপদভাবে মজুত থাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ঘটনায় তিন বাংলাদেশিসহ ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক জমে থাকা এবং কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় একই ধরনের বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। এগুলোতে অ্যাসিড, মিথানল, থিনারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক রয়েছে। দীর্ঘদিন যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করায় কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এসব রাসায়নিক উচ্চ অগ্নিঝুঁকিসম্পন্ন। বন্দরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, যেকোনো সময় এসব কনটেইনারে আগুন লাগতে বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বন্দরের বন্ডেড এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাশাপাশি থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা করে। সেখানে বিপজ্জনক রাসায়নিকের কোনো কনটেইনারে আগুন লাগলে তা আশপাশের পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়া এবং মাটি ও পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, আমদানিকারকদের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে রয়েছে। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করায় নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি এসব রাসায়নিক অপসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনারে থাকা মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব রাসায়নিকের মধ্যে রয়েছে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার।

তবে রাসায়নিক পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কাভার্ড ভ্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় আগুন লাগার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। তবে বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তির জন্য আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন। ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক নিরাপদ স্থাপনায় ধ্বংস করতে হতে পারে।

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রুত অপসারণের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করে নিলামপ্রক্রিয়া চালানো হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার সরিয়ে নেওয়া এবং সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য সরিয়ে নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা থাকলে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। সেখানে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এখন শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার শনাক্ত করা, রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ এবং নিরাপদ সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ