ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ৪ খাতে সংস্কারের পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের

বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাটির মতে, সবুজ তৈরি পোশাক, মধ্যবিত্তের আবাসন, রং ও রঞ্জক উৎপাদন এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা— এই চারটি খাতে সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক বেসরকারি খাতের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের (কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক-সিপিএসডি) তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটির একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এসব খাতে বিনিয়োগের বাধা দূর করা গেলে নির্মাণশিল্পে বছরে ২৩ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশীয়ভাবে রং ও রঞ্জক উৎপাদন বাড়িয়ে ৬ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। আর ডিজিটাল আর্থিক সেবায় সংস্কারের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান হতে পারে ৯৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজার।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপায় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার একটি অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্যাংককের চলমান ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘আনলকিং ইনভেস্টমেন্ট ফর জবস’ শীর্ষক আলোচনায় বাংলাদেশের বিষয়ে প্রশ্ন করেন স্বনামধন্য গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের বিজনেস এডিটর গোলাম মওলা।

প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ সেবাস্তিয়ান বোয়াত্রো বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তার উত্তরে বাংলাদেশের চারটি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগের বাধা দূর করতে নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

চার খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে চারটি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো হলো পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাকশিল্প, মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আবাসন, রং ও রঞ্জক উৎপাদন এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আবাসন নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নির্মাণশিল্পে বছরে ২৩ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশীয় রং ও রঞ্জক উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৬ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি আনুষ্ঠানিক চাকরি সৃষ্টি সম্ভব। অন্যদিকে, ডিজিটাল আর্থিক সেবায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ৯৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বিনিয়োগের অর্থ জোগান দিলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ব্যবসায়িক বাধা দূর করতে হবে। সরকারকে এমন নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতেও এসব খাতে সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন করেন বাংলা ট্রিবিউনের বিজনেস এডিটর গোলাম মওলা। তার প্রশ্ন ছিল উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর কমে যাওয়া আস্থা কীভাবে দূর করা যায়, যাতে আর্থিক খাতের ঝুঁকির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত না হয় এবং অর্থ উৎপাদনশীল ব্যবসায় পৌঁছায়।

এর জবাবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। সংস্থাটির ‘অরিজিনেট-টু-ডিস্ট্রিবিউট’ কৌশলের আওতায় আইএফসি কোনও প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ জোগায় এবং বাকি অর্থের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার চেষ্টা করে। এতে প্রকল্পে আইএফসির নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি অন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে সহায়তা করে।

এর আগে আরেক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে সংস্থাটি। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংক খাতকে আরও শক্তিশালী করা, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট–২’-এর আওতায় আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার, আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি এবং জরুরি তারল্য সহায়তার কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ও এ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত।

এই সহায়তার লক্ষ্য, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা বাড়ানো এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোই মূল চ্যালেঞ্জ

বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় উঠে আসে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের প্রয়োজন অনেক বেশি হলেও ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক পুঁজি প্রত্যাশিত মাত্রায় আসছে না। রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, ঋণঝুঁকি, মুদ্রার ওঠানামা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।

এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন অর্থের জোগান বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যাখ্যায়, গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা সুবিধা রাজনৈতিক, ঋণ ও অন্যান্য ঝুঁকি কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এ জন্য সংস্থাটি ২০২৪ সালে গ্যারান্টি প্ল্যাটফর্ম চালু করে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টি-সংক্রান্ত পণ্য ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য, দেশি-বিদেশি বেসরকারি পুঁজি এমন খাতে নিয়ে যাওয়া, যেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

১১২ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি পুঁজি

বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি গত চার বছরে বেসরকারি খাতে যে বিনিয়োগ সংগ্রহে সহায়তা করেছে, তার পরিমাণ তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে।

তবে বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য, শুধু কত অর্থ সংগ্রহ করা হলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে এবং তা কতটা কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বব্যাংকের কর্মসংস্থান কৌশলে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— মানবসম্পদ ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে সহায়তা। অবকাঠামো ও জ্বালানি, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদনশিল্পকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের জন্য এসব উদ্যোগের তাৎপর্য হলো, বিনিয়োগের বাধা দূর করা, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়ানো এবং সম্ভাবনাময় শিল্পে পুঁজি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বিশ্বব্যাংকের তুলে ধরা কর্মসংস্থানের সংখ্যাগুলো সম্ভাব্য হিসাব; এগুলো বাস্তবায়িত কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান নয়। সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ ও সংস্কার বাস্তবায়নের ওপরই এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো নির্ভর করবে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ