নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলের ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থায় একাধিক দুর্বলতা এবং নিরীক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিটির শেয়ারদরে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ছয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১৪৭ শতাংশ। গত ২৪ মার্চ সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর ছিল ৩৭ টাকা ৭০ পয়সা। আর সর্বশেষ বুধবারের লেনদেন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ টাকা ২০ পয়সায়। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫৫ টাকা ৫০ পয়সা।
শেয়ারদরের এই বড় উত্থানের বিপরীতে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে রয়েছে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য। ধারাবাহিক লোকসান, পুঞ্জীভূত লোকসানও রয়েছে সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরেই কোম্পানিটি ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও লোকসান থেকে বের হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৯ পয়সা। এ ছাড়া ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে চার বছরই কোম্পানিটি লোকসান করেছে।
ধারাবাহিক লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়েও নিরীক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন। ১২৩ কোটি টাকার সম্পদ যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক সোনারগাঁও টেক্সটাইলের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো সম্পদের অস্তিত্ব নিয়েও নিরীক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির ৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার মজুদ পণ্য এবং ৬৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব সরেজমিনে অথবা বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকা মোট প্রায় ১২৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মজুদ পণ্য ও স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিরীক্ষক প্রত্যক্ষ বা বিকল্প প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারেননি। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি কোম্পানির সম্পদ ও আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কাঁচামাল কেনায় নগদ লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন
কোম্পানিটির কাঁচামাল কেনার লেনদেনেও নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৪ কোটি ৭ লাখ টাকার কাঁচামাল কেনার উল্লেখযোগ্য অংশ নগদ অর্থে পরিশোধ করা হয়েছে। এসব লেনদেনের সত্যতা সম্পর্কেও নিরীক্ষক নিশ্চিত হতে পারেননি। ফলে কোম্পানিটির সম্পদ, মজুদ পণ্য এবং কাঁচামাল কেনার লেনদেন—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রশ্ন বা সীমাবদ্ধতার বিষয় উঠে এসেছে।
ঋণ আদায়ে তিন ব্যাংকের আইনি পদক্ষেপ সোনারগাঁও টেক্সটাইলের আর্থিক চাপের আরেকটি দিক হলো ঋণ পরিস্থিতি। কোম্পানির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করছে, অন্যদিকে ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোর আইনি পদক্ষেপের বিষয়ও সামনে এসেছে। অবণ্টিত লভ্যাংশ ও শ্রমিক তহবিল কোম্পানিটির করপোরেট সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ ও ২০২২ সালের অবণ্টিত লভ্যাংশ এখনো বিতরণ করা হয়নি। পাশাপাশি ১০ লাখ টাকার শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলও বিতরণ করা হয়নি বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব বিষয় কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণ কী?
সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর ও লেনদেনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নজরেও আসে। গত ৩ আগস্ট শেয়ারদর ও লেনদেন বৃদ্ধির কারণ জানতে কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা চায় সিএসই। জবাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, শেয়ারটির লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোম্পানির শেয়ারদর গত ছয় মাসে প্রায় ১৪৭ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান, পুঞ্জীভূত লোকসান, ঋণ আদায়ে আইনি পদক্ষেপ এবং সম্পদের অস্তিত্ব যাচাই নিয়ে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
বিজনেস আই/


















