নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানি আইনে নির্ধারিত সীমার তুলনায় এ মালিকানা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিবেদনে শওকত আলী চৌধুরীর নিজের নামে থাকা শেয়ারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা শেয়ারও তাঁর পরোক্ষ মালিকানার আওতায় বিবেচনা করা হয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইস্টার্ন ব্যাংকে শওকত আলী চৌধুরীর সরাসরি শেয়ারধারণের পরিমাণ ৯.৯৮ শতাংশ। এর বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে। সব মিলিয়ে পরিদর্শনে তাঁর সংশ্লিষ্ট মালিকানা ২০.৪৮ শতাংশ বলে হিসাব করা হয়েছে।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ারধারণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আরুশা অ্যান্ড কোম্পানি, নমরিন এন্টারপ্রাইজ, নমরিন পাওয়ার, জেডএস হোল্ডিং, জেডএন এন্টারপ্রাইজ ও আনিকা সিকিউরিটিজ।

এর মধ্যে আরুশা অ্যান্ড কোম্পানির নামে ২০০২ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রায় ৭ লাখ ১৮ হাজার শেয়ার কেনার তথ্য পাওয়া যায়। ওই সময় এসব শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও শেয়ারধারণের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার একত্রে হিসাব করলে তাঁর মোট মালিকানা ২১.১০ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায় বলে পরিদর্শন-সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী পরিমাণটি ২০.৪৮ শতাংশ।
আইনসিদ্ধ সীমার চেয়ে বেশি শেয়ার
ব্যাংকের কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের শেয়ারধারণের ক্ষেত্রে আইনগত সীমা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ইস্টার্ন ব্যাংকে শওকত আলী চৌধুরীর সরাসরি ও পরোক্ষ শেয়ারধারণ সেই সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদের ওপর প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মাধ্যমে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গাড়ি আমদানিতেও প্রশ্ন
শেয়ারধারণের বিষয় ছাড়াও পরিদর্শনে মাল্টি সাফাহ ব্যাগস লিমিটেডের নামে আমদানি করা একটি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পঋণ ও বন্ডেড সুবিধার আওতায় প্রতিষ্ঠানটির নামে মার্সিডিজ-বেঞ্জ এএমজি জি-৬৩ মডেলের গাড়ি আমদানি করা হয়েছিল।
তবে পরিদর্শনের সময় মাল্টি সাফাহ ব্যাগস লিমিটেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগও তদন্তে
শওকত আলী চৌধুরীর সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট থাকার অভিযোগের বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আসে। তবে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতির কারণে এ অভিযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহির প্রশ্ন
ইস্টার্ন ব্যাংক দেশের তালিকাভুক্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির আর্থিক কার্যক্রম ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। এমন একটি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শেয়ারধারণের আইনি সীমা অতিক্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরোক্ষ মালিকানা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠায় ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স ও মালিকানা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শেয়ারধারণ, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা এবং ব্যাংক পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রভাব সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


















