ভারত থেকে আগামী বছরের মার্চের শুরুতে পাইপলাইনে ডিজেল আসবে বাংলাদেশে। পাইপলাইনে আসার কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে এবং জ্বালানি পরিবহনের খরচ কমে আসবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভারতের শিলিগুড়িতে চলছে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তুতি।
বাংলাদেশের পার্বতীপুর প্রস্তুত হচ্ছে ডিজেল সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য। বিপিসির পক্ষে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (এমপিএল) ও ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রথম তিন বছর দুই লাখ মেট্রিক টন, পরের তিন বছর তিন লাখ মেট্রিক টন, এর পরের চার বছর পাঁচ লাখ মেট্রিক টন এবং অবশিষ্ট পাঁচ বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা যাবে।
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন নামের এই প্রকল্পের পরিচালক টিপু সুলতান বলেন, ‘পাইপলাইনের ফিনিশিং পর্যায়ের কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ হবে। জানুয়ারিতে মেকানিক্যাল কমিশন এবং অপারেশনাল কমিশনিং শেষ হলে তা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে। ’

দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেল। বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৬ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশই সরকার সরাসরি আমদানি করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ২০২০ সালে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। ভারতের নুলাইবাড়ি রিফাইনারি লিমিটেড থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর তেল ডিপো পর্যন্ত ১৩১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর পরিকল্পনা করা হয়, যার মধ্যে ভারতের অংশে রয়েছে পাঁচ কিলোমিটার আর বাংলাদেশের অংশে ১২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার।
২০১৭ সাল থেকে নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২২শ টন ডিজেল আমদানি করছে বিপিসি। ট্রেনে করে এ তেল পার্বতীপুরের ডিপোতে পৌঁছাতে সময় লাগে এক মাস। তবে পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ভারত থেকে পার্বতীপুর রেল ডিপোতে ডিজেল আসতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এতে পরিবহন খরচ অনেকটাই কমে যাবে।
চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে ১৫ বছর ডিজেল আনতে পারবে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেল আনার ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে (১৫৯ লিটার) গড়ে ১০ ডলার প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়াসহ অন্য খরচ) দিতে হয় বিপিসিকে। ভারত থেকে আনার ক্ষেত্রে এটি আট ডলার হতে পারে। প্রতি ব্যারেলে দুই ডলার কমলে প্রতি এক লাখ টনে প্রায় ১৫ লাখ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। তাই ভারত থেকে আমদানি হলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। জ্বালানি সরবরাহে সময় কম লাগার পাশাপাশি এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মানুষ। উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারত থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ২০১৮ সালে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাইপলাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারত থেকে পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোতে ডিজেল আসতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সেখান থেকে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় তা সরবরাহ করা হবে। এতে পরিবহন ব্যয় অনেক কমে যাবে। পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোর বর্তমান ধারণক্ষমতা ১৫ হাজার টন থেকে ৪৩ হাজার ৮০০ টনে উন্নীত করা হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি তেল পার্বতীপুরে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক মাস।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ বলেন, ভারত থেকে তেল আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ লক্ষ্যে পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপোর স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানো হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আড়াই লাখ টন তেল আনার কথা রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আনা হলে আমাদের খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। বাইরে থেকে তেল কিনতে জাহাজ ভাড়া ও আনুষঙ্গিকসহ ব্যারেলপ্রতি খরচ পড়ে ১০ ডলার। সেখানে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আনতে খরচ পড়বে ৮ ডলারের মতো। আমরা আশা করছি, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের শুরুর দিকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আনা শুরু করতে পারব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ আহমেদ বলেন, ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আমদানি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বিষয়। এতে আমদানির বিকল্প একটি উৎস তৈরি হচ্ছে। তবে আমরা যদি ডলারের পরিবর্তে রুপিতে লেনদেন করতে পারি, তাহলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমে আসবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটও অনেকাংশে কমে যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজেল আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি হচ্ছে। এখন যদি ডলারের পরিবর্তে রুপিতে আমদানি করা সম্ভব হয় তাহলে আমাদের ডলারসংকট কিছুটা হলেও কমবে। পাইপলাইনে ডিজেল আনার ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। ভবিষ্যতে যদি তারা আমাদের দামে কিছুটা ছাড় দেয়, তাহলে এটা আরো লাভজনক হতে পারে। ’


















