ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:০৪ অপরাহ্ন

বিমা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বিমা আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হবে: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন,বিমা খাতকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বিমা আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হবে। ব্যাংকিং খাতের মতো বিমা খাতেও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এসব পরিবর্তন আগামী দিনে জাতীয় সংসদে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

বিমা খাতেও ব্যাংকিং খাতের মতো অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা বিমা খাতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রণ দেখতে পেয়েছেন। এ কারণে খাতটির নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্রাহক ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বিমা করেন। কিন্তু অনেক বিমা কোম্পানি গ্রাহকদের প্রাপ্য দাবি পরিশোধ করছে না। বর্তমানে প্রায় ৫৭ শতাংশ বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি দাবির মধ্যে ৫৭টি এখনো অনিষ্পন্ন। এ পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। যেসব কোম্পানি যথাসময়ে দাবি পরিশোধ করছে, তারা ভালো করছে। আর যারা দাবি পরিশোধ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেক কোম্পানি গ্রাহকদের পাওনা না মিটিয়ে জমি ও অন্যান্য সম্পদ কিনেছে। তাদের হাতে নগদ অর্থের সংকট থাকলে সম্পদ বিক্রি করেও গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যে ব্যক্তি নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বিমা করেন এবং কষ্টার্জিত অর্থ সেখানে জমা দেন, তাকে কীভাবে সেই অর্থ থেকে বঞ্চিত করা যায়?

তিনি জানান, ইতোমধ্যে কিছু বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। আইডিআরএর চেয়ারম্যানও একটি দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করা। তবে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ করা আইডিআরএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নয়। সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকেই গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও অটোমেশন

বিমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইডিআরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তদারকি ব্যবস্থা আগে কার্যকর না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেশের প্রতিটি বিমা কোম্পানিকে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে এবং লেনদেন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যত বেশি সরাসরি বা শারীরিক যোগাযোগ থাকবে, দুর্নীতির সুযোগও তত বেশি থাকবে। এ কারণে পুরো ব্যবস্থাকে আন্তঃসংযুক্ত করা হচ্ছে। বিমা কোম্পানি ও আইডিআরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ বিমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

দুই সার্ভার ব্যবহারে কঠোর ব্যবস্থা

কিছু বিমা কোম্পানির দুটি সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে যেখানে একটি সার্ভার প্রকৃত তথ্য সংরক্ষণে এবং অন্যটি ভিন্ন ধরনের লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো বিমা কোম্পানিতে দুটি সার্ভার রাখা যাবে না।

নির্ধারিত সময়ের পর পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানিতে দুটি সার্ভারের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক লেনদেনসহ সব ধরনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব ধরনের পরিপালন পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। আংশিকভাবে পরিপালন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

মামলার সুযোগ নিয়ে সুবিধা নেওয়া বন্ধে আইন পরিবর্তন

বিমা খাতসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা এবং আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেউ কেউ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এড়ানোর জন্য আদালতের আশ্রয় নিচ্ছেন এবং এই সুযোগ ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এই সমস্যা দূর করতে বিমা আইনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আইডিআরের ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হবে বলে জানান তিনি।

বিমাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিতে চান

বিমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অর্থনীতিতে বিমার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশে বিমা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশেও বিমা খাতকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিমা কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিমার কার্যক্রম শুধু জীবন বিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সম্পদ, ব্যবসা, বাড়িঘর, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিমার ব্যাপক পরিধি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিমার এই সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিমা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। অনিয়ন্ত্রণ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি এত গভীরে চলে গেছে যে পরিস্থিতি পরিবর্তন করা কঠিন। তবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে এই কঠিন কাজই করতে হবে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন কার্যকরভাবে কাজ শুরু করবে, তখন বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দুর্বল করে আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাদের সেই সুযোগ আর দেওয়া হবে না। ওই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, এখন থেকে বিমা কোম্পানিগুলোকে আইন মেনে, নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে, পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

 

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ