ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু কথা : ডা. সাগর খান

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়, আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ আমরা সবাই একই আদর্শের মানুষ হলেও, কোনো একটি ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা স্বাভাবিক। তাই কারও সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন বিভাজনের কারণ না হয়ে, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি করে, সেটাই কাম্য।

আমার কাছে প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, সেটি হলো সরকারি চাকরির বাস্তবতা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দায়িত্ব পালন করে, তখন তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে সরকারি দায়িত্বই প্রাধান্য পায়। অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হয়, যেটা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে তার ভীষণ অপছন্দের। কিন্তু দায়িত্ব পালন না করলে বদলি, পদোন্নতি আটকে যাওয়া, বিভাগীয় ব্যবস্থা কিংবা আরও নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে সরকারি চাকরির কাঠামোকেই অস্বীকার করা হয়।

এই কারণেই কোনো একটি ছবি, ব্যানার, মঞ্চে উপস্থিতি বা সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরে একজন মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা আদর্শের বিচার করা আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। একটি ছবি হয়তো একটি মুহূর্তের উপস্থিতি দেখাতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের পুরো রাজনৈতিক বিশ্বাস, ব্যক্তিগত অবস্থান বা দীর্ঘদিনের আদর্শকে তুলে ধরে না।

আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে যারা নিজেদের কঠোর জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে পরিচয় দেয়, তাদের অনেকেই অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সময়েই চাকরিতে যোগ দিয়েছে, পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণ নিয়েছে, উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে টিকে থাকা সহজ ছিল না। অনেকেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অন্য পক্ষের চাপে থেকে, পরিবারের কথা চিন্তা করে, কখনো কখনো অন্য পক্ষের সঙ্গে সামান্য কিছু নেগোশিয়েট করে নিজের পেশাগত জীবন অব্যাহত রেখেছে। যদি তা না করতে পারত, তাহলে এখন এই ধারার শতকরা ৯০ ভাগ চাকরিতে বহাল থাকত না। আমার কাছে এটাকে দোষের কিছু মনে হয় না। কারণ বাস্তবতার সঙ্গে আপস করা আর আদর্শ বিসর্জন দেওয়া এক জিনিস নয়।

একইভাবে এটাও সত্য, সেই সময় জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক, শিক্ষক এবং অন্যান্য পেশাজীবীরা ক্ষমতার বাইরে থেকেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেছে, আদর্শ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। যেমন আমাদের মোকাদ্দাস শাহীনকে মাদারীপুর, দিনাজপুর ইত্যাদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ট্রান্সফার করে রাখা হয়েছিল। বেলায়েত আলীকে দিনাজপুরে এবং আমাদের একসময়ের শিক্ষক ডা. আজিজুর রহিমকে দিনাজপুরে পোস্টিং করা হয়েছিল। এরকম চাপ অনেকেই সহ্য করতে পেরেছে, আবার অনেকে পারেনি। এগুলো সেই সময়ের কঠিন বাস্তবতা। তাই কেবল বাহ্যিক উপস্থিতি বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে কারও আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব সহজ হলেও, সেটি সব সময় ন্যায্য নাও হতে পারে।

যদি সত্যিই অতীতের ভূমিকার মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সময় আসে, তাহলে সেই মূল্যায়নের নীতি সবার জন্য সমান হতে হবে। একই মানদণ্ড যদি শুধু স্বাস্থ্য ক্যাডারের কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্যের প্রশ্ন উঠবে। কারণ একই সময়ে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, প্রকৌশলসহ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারাও সরকারি দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের ভেতর অসংখ্য জাতীয়তাবাদী বিশ্বাসী কর্মকর্তা ছিল। তারাও বঞ্চনার শিকার হয়েছে, কিন্তু কোনো না কোনো উপায়ে তাদের টিকে থাকতে হয়েছে। তাহলে একই প্রশ্ন কি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, নাকি শুধু স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য প্রযোজ্য হবে? যদি না হয়, তাহলে কেন হবে না? যদি প্রযোজ্য হয়, নিশ্চয়ই মবক্রেসি করে নয়, একটি শান্তিপূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই প্রশ্নেরও একটি যৌক্তিক উত্তর থাকা দরকার।

আবার যদি সিদ্ধান্ত হয় যে বিষয়টি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ক্যাডারের মধ্যেই মূল্যায়ন করা হবে, তাহলেও সেটা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে, ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে নয়। অবশ্যই সাংবিধানিক নীতিমালার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাহলে তা বড় পদ, ছোট পদ, সিনিয়র, জুনিয়র, পরিচিত বা অপরিচিত, সবার জন্য একই নিয়মে প্রযোজ্য হতে হবে। কারণ একই ঘটনার জন্য একজনের ক্ষেত্রে এক ধরনের সিদ্ধান্ত এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত সংগঠনের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করে।

একইভাবে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে যারা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এসে জাতীয়তাবাদী ব্যানারে যুক্ত হয়েছে, তাদের বিষয়েও একটি মূল্যায়ন হওয়া উচিত উচ্চপর্যায়ের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের আলোচনার মাধ্যমে। ব্যক্তি বা গ্রুপভিত্তিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ হওয়াই সংগঠনের জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পথ।

আমার বিশ্বাস, কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনৈতিক আদর্শ বা পারিবারিক মূল্যবোধ মুছে ফেলতে পারে না। আদর্শ মানুষের ভেতরের বিষয়। সময়ের প্রয়োজনে কেউ চুপ থাকতে পারে, দায়িত্ব পালন করতে পারে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, কিন্তু সেটাই তার চূড়ান্ত আদর্শের পরিচয় নয়।

সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, অভিযোগও থাকতে পারে। কিন্তু তার সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, তথ্য-প্রমাণ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ব্যক্তি অপমান, মব সৃষ্টি, জনচাপ বা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া সাময়িকভাবে কারও কাছে সন্তোষজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো সংগঠন, কোনো পেশা বা কোনো আদর্শের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।

আমার প্রত্যাশা একটাই। আমরা যেন ব্যক্তি নয়, নীতিকে গুরুত্ব দিই। বিচার যদি হয়, সেটি যেন সবার জন্য একই মানদণ্ডে হয়। আর সমাধান যদি হয়, সেটি যেন হয় সম্মানজনক, সাংগঠনিক এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে। তাহলেই সংগঠনও শক্তিশালী হবে, আদর্শও মর্যাদা পাবে।

ডা.সাগর খান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ