জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি উভয় খাতই গভীর সংকটে পড়েছে। তীব্র গরমে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমার কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাপমাত্রা বৃদ্ধি,আর্দ্রতা পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে অস্বাভাবিকতার কারণে ডেঙ্গু সংক্রমণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে উঠেছে। বায়ুদূষণ বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ।
এসব তথ্য উঠে এসেছে দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন অন হেলথ অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিএইচইআর) এবং দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন গ্লোবাল টিম। এতে সহায়তা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ও গ্রিনথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ড. সৌর দাশগুপ্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ব্যক্তি ২৮ দশমিক ৮ দিন করে তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১৩ দশমিক ২ দিন সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘটেছে। তাপজনিত শ্রম উৎপাদনশীলতা হ্রাসে বাংলাদেশের মোট আয় ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার; যা দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতের আয়ের ৫৫ শতাংশের সমান। শুধু তাপপ্রবাহজনিত কারণে এ বছর প্রায় ২৯ বিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় অংশ কৃষি খাতে। নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার ৬৪ শতাংশই কৃষি শ্রমিকদের।
প্রতিবেদন বলছে, ১৯৫১-১৯৬০ সময়ের তুলনায় ২০১৫-২০২৪ সময়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের উপযোগী পরিবেশ বেড়েছে ৯০ শতাংশ। এর পেছনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতা পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে অস্বাভাবিকতা দায়ী। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো এখন নতুন মহামারির ঝুঁকিতে।বায়ুদূষণ এখনও বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২২ সালে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (পিপিএম২.৫) সংস্পর্শে ২ লাখ ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে; যা ২০১০ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। এরমধ্যে ৯০ হাজার মৃত্যু সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর সঙ্গে যুক্ত; যার মধ্যে ৩০ হাজার মৃত্যু ঘটেছে কয়লা পোড়ানোর কারণে। ঘরোয়া বায়ুদূষণে প্রতি এক লাখে ৭৪ জন মারা যায়; যা নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার এখনও মাত্র দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়েছে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা নিঃসরণ হ্রাস বা কার্বন ট্যাক্স থেকে অর্জিত যেকোনো অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে বহুগুণ বেশি।প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তাদের অধিকাংশই এমন এলাকায় বাস করেন, যেগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক মিটারেরও কম উচ্চতায়। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানির সংকট ও প্রজননজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এই জনপদগুলোতে ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব পড়ছে। গত এক হাজার বছর ধরে যা হয়নি, তা আগামী ৩০ বছরে ঘটবে।

ইতোমধ্যে আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা দেখেছি। এখন সময় জলবায়ু-স্বাস্থ্য সংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলায় কাজে নামার।তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় মানুষ এখন বৃষ্টির পানি ট্যাঙ্কে জমিয়ে রাখছে, কারণ পান করার মতো পানি নেই। পরিবারগুলো ৩-৪ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাঙ্ক কিনছে। এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব ভয়াবহ।পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, ‘আমরা সাভারকে নিয়ন্ত্রিত বায়ুমান অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছি, সেখানে ইটভাটা চালানোর সুযোগ নেই।
গৃহস্থালি বায়ুদূষণ কমাতে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় বৈদ্যুতিক চুলা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা।’
ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম বলেন, স্বাস্থ্য তাদের জলবায়ু কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ও এনডিসি কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে স্থানীয় সমাধানগুলো বাস্তবায়নে তারা কাজ করছেন।ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা মিশা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু নীতিগতভাবে স্বাস্থ্য অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। এখন সময় এসেছে একে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানে মূল স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পল্লী-কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ, ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াসিস পেরে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ড. ইকবাল কবির।ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়–এটি বর্তমানের জরুরি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট।
তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ, অপুষ্টি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও রোগবিস্তার–সব মিলিয়ে কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে।অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ উন্নয়নের অর্জন হারানোর পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও স্বাস্থ্য অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদারের আহ্বান জানান। বিশেষ করে আসন্ন কপ-৩০ সম্মেলনে এ দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়। ###
লেখক,আলমগীর হোসেন


















