চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে সাবেক এমপি সাইফুলসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড ও আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ঘোষিত রায়ে পলাতক প্রধান আসামি সাইফুল ইসলামের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। মামলার মোট ১৬ আসামির মধ্যে বর্তমানে আটজন কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— মো. আব্দুল্লাহিল কাফী (সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ঢাকা জেলা), মো. শাহিদুল ইসলাম (সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সাভার সার্কেল), ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল।
অন্যদিকে সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান রিপন, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এএফএম সায়েদসহ আটজন এখনও পলাতক রয়েছেন।
এ মামলায় এসআই শেখ আবজালুল হক নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করেছে।

গত ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিখণ্ডন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন, মিরাজুল আলম, আবুল হাসান এবং আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২ জুলাই প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগপত্রের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্যসূত্র, ৬২ জন সাক্ষীর তালিকা, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণাদি এবং দুটি পেনড্রাইভ দাখিল করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
গত বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। উপস্থিত আট আসামির মধ্যে সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও এসআই শেখ আবজালুল হক দোষ স্বীকার করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ছয় তরুণ নিহত হন। পরে তাদের মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। অভিযোগে বলা হয়, ওই সময় একজন এখনও জীবিত ছিলেন এবং তাকেও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন একই এলাকায় আরও একজন নিহত হন। এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায়
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি তৃতীয় রায়। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংঘটিত অপরাধের নৃশংসতা, পরিকল্পিত ধরন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে এ রায় দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণাকে ঘিরে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট মোতায়েন ছিল। এই রায় দেশের বিচার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


















