আবারও আলোচনায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা। এ নিয়ে ঢাকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও চলছে তর্ক। তেমনই সময় ভারতের আসামের গৌহাটিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালকরা বৈঠকে বসছেন।
মঙ্গলবার শুরু হয়ে পাঁচ দিনের বৈঠক শেষ হবে ২৬ ডিসেম্বর। মহাপরিচালক পর্যায়ে পর্যায়ে এটি ৫১তম বৈঠক।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করবেন।
অপরদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানার নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেবে। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, ফ্রন্টিয়ার আইজিগণ এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ প্রতিনিধিত্ব করবেন। রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে বিজিবি।
বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো ও আহত বা হত্যা করা সম্পর্কে প্রতিবাদ জানানো এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে করণীয় নির্ধারণ, ভারত হতে বাংলাদেশে ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ, গাঁজা, হেরোইন এবং ভায়াগ্রা, সেনেগ্রাসহ বিভিন্ন প্রকার অবৈধ মাদকদ্রব্যের চোরাচালান রোধ।

এ ছাড়া ভারতের অভ্যন্তরে ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য মাদকদ্রব্যের কারখানা, গুদাম এবং মাদকের চোরাচালান রোধ, মাদক পাচারকারীদের সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়। ভারত হতে বাংলাদেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালান রোধ এবং অস্ত্র চোরাচালান রোধে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য বিনিময়।
বিএসএফ এবং ভারতীয় নাগরিক কর্র্তৃক সীমানা লঙ্ঘন বা অবৈধ পারাপার বা অনুপ্রবেশ রোধ। সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ভারত কর্র্তৃক অনুমোদনহীন উন্নয়নমূলক নির্মাণকাজ না করা এবং বন্ধ থাকা বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করা। উভয় দেশের সীমান্ত এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন। রাজশাহী সীমান্তের চর মাজারদিয়া ও চর খানপুর এলাকার স্থানীয় জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে পদ্মা নদীর ভারতীয় অংশ ব্যবহারের অনুমতি নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা। ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়।
এ দিকে বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অপরাধ বন্ধ করা গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানিও আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে, এই কৌশলগত অবস্থান নিয়েই বিএসএফের শীর্ষ নেতৃত্ব বিজিবি-র সঙ্গে আলোচনায় বসছে।
তার আগে বিএসএফের জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এই সম্মেলনের ‘ফোকাস’ হবে যৌথ পদক্ষেপ নিয়ে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বন্ধ করা।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ— চলতি বছরে বিএসএফের হাতে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। কয়েক দিন আগে ভারত-বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ভার্চুয়াল সামিটের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশনা তিনি নিজে দেবেন বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশকে কথা দিয়েছেন।
সেই সামিটের ঠিক পর পরই গুয়াহাটির সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান।
বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক প্রকাশ সিং বিবিসিকে বলেন, “দেখুন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গরু ও মাদক পাচার-সহ নানা ধরনের সমস্যা আছে। ভারতীয়রা গরু পাচার করতে চায়, বাংলাদেশিরা নিতেও চায়।”
“কখনো কখনো এই সশস্ত্র পাচারকারীরা বিশ-তিরিশ জনের দল বেঁধে এলে বিএসএফের গুলি চালানো ছাড়া রাস্তা থাকে না।”
সীমান্ত ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন পশ্চিমবঙ্গে ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিন্দিতা ঘোষাল। তিনি বিবিসিকে বলেন, তথাকথিত এই সব সীমান্ত অপরাধ বা ‘ট্রান্স বর্ডার ক্রাইমে’র সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের যোগসাজশও কিন্তু সুবিদিত।
“আমরা এখানে যেটাকে ‘ক্রাইম’ বলি কিংবা যাদেরকে অপরাধী বা ক্রিমিনাল বলে চিহ্নিত করি, বর্ডার এলাকায় গিয়ে কিন্তু দেখতে পাই ‘নেশন স্টেট’ বা রাষ্ট্রই সেই ক্রিমিনালদের তৈরি করেছে।”
“সীমান্ত পেরিয়ে যে লোকগুলো আসার চেষ্টা করছে তাদের কিন্তু দেখা যাবে সাহায্য করছে এই নেশন স্টেটের বৈধ নাগরিকরাই। টাকাপয়সার হাতবদল হচ্ছে, আধাসামরিক বাহিনীকে অর্থ দিয়ে পারাপার চলছে – গ্রাউন্ড লেভেলে বিষয়টা ওভাবেই চলে।”
অনিন্দিতা আরও বলেন, “ফলে নেশন স্টেটও সীমান্তটা ওভাবেই ‘পোরাস’ করে রাখে, ফুটোফাটা সারায় না – কারণ তাতে তাদেরই সুবিধে।”
সম্প্রতি ভারতে বিএসএফের পদস্থ কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়েছে মুর্শিদাবাদ সীমান্তে গরু পাচারের ঘটনায়, তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছে। সূত্র: দেশ রূপান্তর


















