চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন পিছিয়ে আগামী ৮ ডিসেম্বর ধার্য করেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা দাখিল করতে পারেননি। এ জন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন এ দিন ধার্য করেন।
মামলার আসামিরা হলেন- সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)। এ ছাড়া, মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্যতম আসামি ডনকে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর ২০ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। ২৭ আগস্ট রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ৯ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ, যার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। সে সময় চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশে অপমৃত্যু মামলার পাশাপাশি হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে সিআইডি। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।
সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন।
এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। তবে রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানালে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন।
পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
পিবিআই জানায়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই আরও উল্লেখ করে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং স্ত্রী সামীরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তবে ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তিনি আরও তদন্তের দাবি জানান।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেন।
এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে এর শুনানি আর হয়নি।
গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় তার মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
একই সঙ্গে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন আদালত। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেছে।


















