ঢাকা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার: ঘাটতি পূরণের সেরা প্রাকৃতিক উৎস

নিয়মিত রোদে হাঁটছেন, পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছেন, এমনকি ভিটামিন ডির সাপ্লিমেন্টও নিচ্ছেন। তবু শরীরে ভিটামিনটির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন সমস্যা দেখা যায়। অথচ হাড় ও পেশি মজবুত রাখা থেকে শুরু করে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ভিটামিন ডির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রোদে থাকা কিংবা ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেলেই হবে না, শরীর সেই ভিটামিন কতটা শোষণ ও ব্যবহার করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কিছু সমস্যা এবং জীবনযাপনের নানা কারণে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি পেয়েও শরীরে এর ঘাটতি থেকে যেতে পারে।

ভিটামিন ডি মূলত শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে। হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত রাখার পাশাপাশি পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কাজেও এর ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি এবং অস্টিওম্যালেশিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতি রিকেটসের কারণ হতে পারে। সূর্যের অতিবেগনি রশ্মির প্রভাবে ত্বকে স্বাভাবিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তবে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে থাকা, পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়া, বয়স, ত্বকের বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন কারণে শরীরে এর উৎপাদন কম হতে পারে। এ ছাড়া কিছু খাবার ও সাপ্লিমেন্ট থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।

চালের গুঁড়াতেই ফিরতে পারে ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা

রোদে থেকেও কেন ভিটামিন ডির ঘাটতি মেটে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ডির ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত চর্বি না থাকা: ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয়। তাই খাবারের সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকলে এটি শোষণে সুবিধা হয়। বিশেষ করে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট প্রধান খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করলে শোষণ ভালো হতে পারে। ডিম, বাদাম, দুধ কিংবা স্বাস্থ্যকর তেলযুক্ত খাবার এ ক্ষেত্রে সহায়ক। তবে খালি পেটে সাপ্লিমেন্ট খেলেই যে তা কাজ করবে না, এমন নয়।

হজম ও অন্ত্রের সমস্যা: অন্ত্রের কিছু রোগ শরীরের ভিটামিন ডি শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সেলিয়াক ডিজিজ, ক্রোনস ডিজিজ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস এবং চর্বি শোষণজনিত সমস্যায় ভিটামিন ডির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ ধরনের রোগ থাকলে শুধু সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা: শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে রক্তে ভিটামিন ডির মাত্রা তুলনামূলক কম থাকতে পারে। কারণ, এই ভিটামিন শরীরের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে সঞ্চিত হয়। ফলে স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডির চাহিদা ও ঘাটতি পূরণের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
লিভার ও কিডনির সমস্যা: ভিটামিন ডি শরীরে কার্যকর রূপে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য লিভার ও কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রয়োজন। এসব অঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে ভিটামিন ডির বিপাক ব্যাহত হতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি গ্রহণের পরও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি: শরীরে ভিটামিন ডির বিপাক ও কার্যক্রমে ম্যাগনেশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই খনিজের ঘাটতি থাকলে ভিটামিন ডির স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। ম্যাগনেশিয়ামের জন্য খাদ্যতালিকায় বাদাম, পালং শাক, ডাল, কলা ও বিভিন্ন দানাশস্য রাখা যেতে পারে।
কিছু ওষুধের প্রভাব: দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট কিছু স্টেরয়েড, খিঁচুনি প্রতিরোধী ওষুধ এবং চর্বি শোষণ কমায় এমন ওষুধ ব্যবহারের ফলে ভিটামিন ডির মাত্রা কমে যেতে পারে। নিয়মিত এসব ওষুধ গ্রহণ করলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।

সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে অনিয়ম: অনেকেই মনে করেন, কয়েক দিন ভিটামিন ডির ওষুধ খেলেই ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে। বাস্তবে ঘাটতির মাত্রা, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে সময় লাগতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময় পর রক্ত পরীক্ষা করে ভিটামিন ডির মাত্রা যাচাই করা যেতে পারে।

যেসব খাবারে মিলবে ভিটামিন ডি

সূর্যালোকের পাশাপাশি কিছু খাবার থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া সম্ভব। তবে প্রাকৃতিকভাবে এই ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবারের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ফিট থাকতে জিম কি সত্যিই প্রয়োজন?

চর্বিযুক্ত মাছ: স্যালমন, ম্যাকেরেল, সার্ডিন ও টুনার মতো মাছে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এসব মাছ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও প্রোটিনেরও ভালো উৎস। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে এসব মাছ রাখা উপকারী।

মাছের তেল: বিশেষ করে কড লিভার অয়েল ভিটামিন ডির সমৃদ্ধ উৎস। তবে এতে ভিটামিন এ-ও বেশি থাকতে পারে। তাই অতিরিক্ত গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে এবং সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ডিমের কুসুম: ডিমের কুসুমে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ভিটামিন ডি থাকে। এর পরিমাণ মুরগির খাদ্য ও উৎপাদনপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক হলেও শুধু একটি ডিম দিয়ে দৈনিক ভিটামিন ডির পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।
মাশরুম: সূর্যালোক বা অতিবেগনি রশ্মির সংস্পর্শে আসা মাশরুমে ভিটামিন ডি২ তৈরি হয়। তবে সব ধরনের মাশরুমে সমান পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে না। বিশেষ করে অতিবেগনি রশ্মিতে প্রক্রিয়াজাত মাশরুমে এর পরিমাণ বেশি হতে পারে।

দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার: ভিটামিন ডি যুক্ত বা ফোর্টিফায়েড দুধ, দই এবং কিছু দুগ্ধজাত খাবার থেকে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। তবে সাধারণ দুধে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডির পরিমাণ খুব কম। তাই কেনার সময় পণ্যের মোড়কে ভিটামিন ডি সংযোজনের তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
ফোর্টিফায়েড খাবার: কিছু ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, সয়া মিল্ক, উদ্ভিজ্জ দুধ ও প্যাকেটজাত খাবারে উৎপাদনের সময় ভিটামিন ডি যোগ করা হয়। এসব খাবারও ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।

হাড় মজবুত রাখতে আরও যেসব খাবার জরুরি

শুধু ভিটামিন ডি নয়, হাড়ের সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ম্যাগনেশিয়ামসহ আরও কিছু পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা জরুরি। দুধ, দই, পনির ও কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। অন্যদিকে বাদাম, ডাল, সয়াবিন, পালং শাক ও বিভিন্ন সবুজ শাকসবজি থেকে ম্যাগনেশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পাওয়া যায়। কলা, শুকনো ডুমুর, খেজুর, কিসমিস ও আলুবোখরার মতো ফলেও পটাশিয়াম, আঁশ ও কিছু খনিজ রয়েছে। এগুলো সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে উপকারী হলেও ভিটামিন ডির উল্লেখযোগ্য উৎস নয়। একইভাবে লাউ, করলা, কুমড়া, গাজর, ঝিঙে কিংবা রাঙা আলুতেও স্বাভাবিকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে না। তাই শুধু এসব ফল ও সবজি খেয়ে ভিটামিন ডির ঘাটতি পূরণ হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

ভিটামিন ডির ঘাটতি দূর করতে করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে ভিটামিন ডির স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং নিয়মিত শরীরচর্চার সমন্বয় প্রয়োজন। সূর্যালোকের সাহায্যে ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা দিনের সময়, ঋতু, আবহাওয়া, ত্বকের রং ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। তাই সবার জন্য নির্দিষ্ট ১৫ বা ২০ মিনিট রোদে থাকলেই পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার অতিরিক্ত রোদে থাকার ফলে ত্বকের ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে।

চিয়া সিড খাওয়ার সেরা সময় কখন, ওজন বুঝে যেভাবে রাখবেন ডায়েটে

হাড় মজবুত রাখতে নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা এবং উপযোগী ভারবহনকারী ব্যায়াম উপকারী। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন গ্রহণ, ধূমপান পরিহার এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার দিকেও নজর দিতে হবে। ভিটামিন ডির ঘাটতি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে ২৫-হাইড্রক্সি ভিটামিন ডির মাত্রা পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে সবার নিয়মিত এই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। ঘাটতির মাত্রা ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট ও তার মাত্রা নির্ধারণ করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নিজে থেকে দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সুস্থ হাড় ও পেশির জন্য তাই শুধু ভিটামিন ডি গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; শরীর যাতে তা সঠিকভাবে শোষণ ও ব্যবহার করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত রোদে থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে ঘাটতি মোকাবিলার কার্যকর উপায়।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ