ইউরোপজুড়ে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজগুলোতে ধারাবাহিক বোমা হামলার হুমকির ঘটনায় জরুরি তল্লাশি চালানো হয়েছে। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর কাছে একটি বিমানবন্দর কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, রায়ানএয়ারের একটি উড়োজাহাজকে ইতালির রোম পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে গেছে দেশটির বিমানবাহিনী।
পরবর্তীতে মঙ্গলবারের এসব হুমকির সবগুলোই ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাতটি ফ্লাইট ও ইসরায়েলগামী একটি প্রমোদতরীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। পরে সবগুলো ফ্লাইটই নিরাপদে অবতরণ করেছে। আর প্রমোদতরীতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালিয়ে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
হুমকির কারণে যেসব বিমান সংস্থার ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে, সেগুলো হলো রায়ানএয়ার, উইজ এয়ার, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স এবং পোলিশ বিমান সংস্থা এলওটি। আয়ারল্যান্ডের সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা রায়ানএয়ারের বিভিন্ন গন্তব্যের চারটি ফ্লাইটকে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
কেউ এর দায় স্বীকার করেনি এবং কর্মকর্তারাও কাউকে দায়ী করেননি।

সোমবার বুলগেরিয়াগামী একটি উড়োজাহাজ মাঝ আকাশে থাকাকালে একই ধরনের হুমকি পেয়ে পথ ঘুরিয়ে হাঙ্গেরিতে গিয়ে অবতরণ করে।
বিমানবন্দর বন্ধ
পোল্যান্ডে ওয়ারশগামী দুটি ফ্লাইটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
কোপেনহেগেন থেকে আসা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এসকে৭৫১ ওয়ারশর শোপেন বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। শোপেন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটিতে তল্লাশি চালানোর সময় একটি রানওয়ে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
পোলিশ বার্তা সংস্থা পিএপিকে এয়ারলাইন্সটির মুখপাত্র অ্যালেক্সান্ড্রা লিন্ডগ্রেন কাউকজি বলেছেন, “উড়োজাহাজটি স্বাভাবিকভাবেই অবতরণ করেছে। যাত্রীরা নেমে গেছেন। এটি কোনো জরুরি অবতরণ ছিল না।”
তিনি জানান, হুমকির বিষয়টি পোল্যান্ডের পুলিশকে জানানো হয়েছে।
পোল্যান্ডের এলওটি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট লন্ডনের হিথ্রো থেকে শোপেন বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু হুমকি পাওয়ার পর সেটিকে ওয়ারশর আরেক বিমানবন্দর মোদিলিনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। হুমকির সতর্কতা জারির পর বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়।
এই উড়োজাহাজটি ছিল একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। এটি নিরাপদে অবতরণ করে। মোদিলিন বিমানবন্দরের এক মুখপাত্র বলেন, “(তল্লাশি চালিয়ে) কিছুই পাওয়া যায়নি।”
বিমানবন্দরটির কর্মকর্তারা জানান, পরে বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু করা হয়।
ইতালিতে রায়ানএয়ারের ফ্লাইট এফআর৯৬১১-কে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন থেকে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে আসার সময় দুটি ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে। উড়োজাহাজটি সেখানে স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইতালির বিমানবাহিনী জানিয়েছে, একটি বেসামরিক উড়োজাহাজ ‘সম্ভাব্য হুমকির মুখে পড়েছে’, এমন খবর পাওয়ার পরপরই তারা দ্রুত সাড়া দিয়েছে।
পর্তুগালের লিসবন থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি আগের ফ্লাইট, যা এর আগে ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল, সেটির ক্ষেত্রেও বোমাবিরোধী সতর্কতা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বিমান সংস্থাটির ভাষ্যমতে, যাত্রী, মালপত্র ও বিমানটিতে তল্লাশি চালিয়ে ‘কোনো কিছু পাওয়া যায়নি’। এরপর সতর্কাবস্থা তুলে নেওয়া হয়।
স্পেনের জাতীয় বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ‘আয়েনা’ জানিয়েছে, ম্যানচেস্টার থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটে ‘বোমা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা’ পাওয়ার পর তারা জরুরি প্রোটোকল কার্যকর করে। পরে উড়োজাহাজটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই অবতরণ করে।
বুলগেরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইতালির বার্গামো থেকে আসা উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় অবতরণের পর সেটিতে তল্লাশি চালানো হয়।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডাবলিন থেকে সোফিয়াগামী রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। তবে কোনো উড়োজাহাজেই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
সোমবার একই ধরনের একটি ঘটনার পর এই হুমকিগুলো আসে। এদিন লন্ডনের লুটন বিমানবন্দর থেকে সোফিয়াগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইটে মাঝ আকাশে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হলে সেটিকে বুদাপেস্টের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
হাঙ্গেরির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোমুলুস রুসিন-সেন্দি ফেসবুকে জানিয়েছেন, ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বিমানটিকে শনাক্ত করেছিল। তিনি জানান, হাঙ্গেরির গ্রিপেন যুদ্ধবিমানগুলো ‘কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশে উড্ডয়ন করে’ এবং উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে মাটিতে নামতে সহায়তা করে।
‘হাইব্রিড’ আক্রমণ
মঙ্গলবার গভীর রাতে গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানায়, পানামার পতাকাবাহী প্রমোদতরী ‘ক্রাউন আইরিস’-এ বোমা হামলার হুমকির পর সিরোস দ্বীপের অদূরে নোঙর করা জাহাজটি থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাহাজটিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। এটি ইসরায়েলের হাইফার দিকে যাচ্ছিল। জাহাজটিতে নিবিড় তল্লাশি চালানোর পরও কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি। জাহাজটির আবার যাত্রা শুরু করার কথা রয়েছে।
যদিও বোমা হামলার হুমকির বিষয়ে কোনো দেশই সরাসরি কাউকে দায়ী করেনি, তবে এমন সময়ে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে, যখন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা রাশিয়া ও ইরান—উভয়কেই তাঁদের ভাষায় ‘হাইব্রিড আক্রমণ’ ও ‘অন্তর্ঘাতমূলক’ কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করছেন।
মস্কো ও তেহরান, উভয়ই এ ধরনের কোনো অভিযানের কথা অস্বীকার করেছে।
চলতি সপ্তাহে অজ্ঞাত হ্যাকাররা ইউরোপের কয়েকটি দেশের সুপারমার্কেটগুলোতে থাকা রেফ্রিজারেটরগুলো অকেজো করে দিয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বোমা হামলার ভুয়া হুমকিগুলো সম্ভবত একই ধরনের কম খরচের ও অস্বীকারযোগ্য অন্তর্ঘাতমূলক প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
বিমান চলাচলের ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘অস্প্রে ফ্লাইট সলিউশনস’-এর অ্যানালাইসিস আউটপুট ম্যানেজার রিস জোন্স বলেছেন, একদিনে সাতটি নিশ্চিত বোমা হামলার হুমকি, যার ফলে বিভিন্ন ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা।


















