ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ৭:২৩ অপরাহ্ন

টেকসই অর্থায়নে বিতরণ ১৭,৯২৭ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৭২.২৯ শতাংশ

ব্যাংকিং খাতে প্রথম ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ ইউসিবির

ব্যাংকিং খাতে প্রথমবারের মতো ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সংস্করণসহ ২০২৫ সালের সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। ‘ট্রান্সফর্মিং ইনটেন্ট ইনটু প্ল্যানেটারি ইমপ্যাক্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ব্যাংকটির তৃতীয় সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট। এতে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব, সুশাসন, জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই অর্থায়নে ব্যাংকের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।

সম্প্রতি ব্যাংকটির করপোরেট অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির। এ সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশের মানদণ্ড আইএফআরএস এস১ ও এস২ (IFRS S1 ও S2) অনুসরণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউসিবি টেকসই অর্থায়ন খাতে ১৭ হাজার ৯২৭ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করেছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণ বিতরণের ৭২.২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

একই সময়ে ব্যাংকটি পরিবেশবান্ধব খাতে বা গ্রিন ফাইন্যান্সে ৪৮৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। এ পরিমাণ ব্যাংকটির মেয়াদি ঋণ বিতরণের ৩০.৪০ শতাংশ, যেখানে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ শতাংশ। বছর শেষে ইউসিবির গ্রিন ফাইন্যান্সের বকেয়া স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪৪ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে সহায়তার অংশ হিসেবে ইউসিবি ২৭টি এলইইডি (LEED) সনদপ্রাপ্ত গ্রিন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি প্ল্যাটিনাম ও ১৩টি গোল্ড সনদপ্রাপ্ত। এ ছাড়া দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি কার্যক্রমে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে ব্যাংকটি।

প্রতিবেদনে ব্যাংকটির কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের সহযোগিতায় নিজস্ব কার্যক্রম থেকে সরাসরি এবং জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ—স্কোপ ১ ও স্কোপ ২—হিসাব করেছে ইউসিবি। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জয়েন্ট ইমপ্যাক্ট মডেল (জেআইএম) ফাউন্ডেশনের কাঠামো ব্যবহার করে ঋণ ও অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিঃসরণ বা স্কোপ ৩ পরিমাপ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউসিবির অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ ছিল ১৯ লাখ ১২ হাজার ২১২ দশমিক ০৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (TCO₂e)। প্রতি কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে কার্বন নিঃসরণের ঘনত্ব ছিল ৩৭.৫২ টন TCO₂e।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ঋণ মূল্যায়ন ও অর্থায়ন কার্যক্রমে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভৌত ঝুঁকি এবং কম-কার্বন অর্থনীতিতে উত্তরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা জোরদার করছে। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমেও কম-কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে ইউসিবি।

অনুষ্ঠানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেন, “জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি একটি দেশে পরিচালিত ব্যাংক হিসেবে ইউসিবি বিশ্বাস করে, মূলধনকে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে হবে।”

পরিবেশগত উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণেও কাজ করছে ইউসিবি। বর্তমানে ব্যাংকটির ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎচালিত শাখা ও চারটি সোলার এটিএম রয়েছে। এ ছাড়া, দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৩০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং গ্রাম ও শহরের উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ৫০টি বিশেষায়িত সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স হেল্প ডেস্ক পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউসিবির বিতরণ করা ঋণ দেশের বিভিন্ন খাতে দুই লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এসব কর্মসংস্থানের প্রায় ৩০ শতাংশে রয়েছেন নারী কর্মী। এ ছাড়া, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি জাতীয় কোষাগারে ১৮ হাজার ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে।

ইউসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, “ইউসিবিতে আমরা টেকসই ব্যাংকিংকে কেবল করপোরেট বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখি না; বরং একে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অপরিহার্য ভিত্তি মনে করি।”

ওয়েবভিত্তিক ইন্টারেক্টিভ সংস্করণ প্রকাশের মাধ্যমে টেকসই কার্যক্রম ও অগ্রগতির তথ্য পাঠক, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনের কাছে আরও সহজে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে ইউসিবি।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ