আলাস্কায় বৈঠকের আগে করমর্দন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: বিবিসি
রাশিয়া থেকে অন্তত ৪৮ লাখ টন ডিজেল আমদানির ব্যাপারে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই রাশিয়া থেকে এই তেল আমদানির ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দেওয়া মার্কিন উপহার। তার মতে, এই চুক্তি এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগের শামিল, যা দীর্ঘায়িত না করে বন্ধ করা উচিত।
বিবিসি জানায়, নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল আমদানির এই তথ্য জানান।
বার্তায় ট্রাম্প জানান, পুতিন অবিলম্বে ৩ লাখ টন ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহে সম্মত হয়েছেন। আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া স্বল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর সক্ষমতার ওপর এই অতিরিক্ত সরবরাহ নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।

এই চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোতে থাকা রাশিয়ার অন্যান্য সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার ডিজেল বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে একটি অস্থায়ী লাইসেন্স জারি করেছে।
এদিকে এই ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ডিজেল সরবরাহের বিনিময়ে ইউক্রেনের ওপর আরও সন্ত্রাস চালাবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তায় সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। জেলেনস্কি আরও লেখেন, ইউক্রেনের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্র জীবন ও মানুষের সুরক্ষায় ন্যায্য সমর্থন দেবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করবে—দুর্বল অবস্থান থেকে নয়।
অন্যদিকে পুতিন বলেছেন, শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তার কথা হয়েছে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে তার বিবৃতিতে সরবরাহের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ডিজেল ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বিশ্বকে উপকৃত করবে।
ট্রাম্পের ঘোষিত পরিমাণে রাশিয়া আদৌ ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না এবং এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কুইল্টার শেভিওটের কৌশলবিদ টিম আর্মিটেজ বলেন, ট্রাম্পের ঘোষিত প্রথম দফার ৩ লাখ টন ডিজেল প্রায় ২২৫ লাখ ব্যারেলের সমান। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ডিজেলের ব্যবহার প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল। ফলে প্রথম দফার সরবরাহ দেশটির পাম্পে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না।
তার মতে, পরবর্তী সময়ে আরও চালান এলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের এ উদ্যোগকে কিছুটা মরিয়া পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬ দশমিক ২৮ ডলার। দেশটির অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছিল।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো বেশি। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারের ওপরে রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে এই তেলের দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার।
রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গেও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়ে আইন পাস হয়, যাতে ট্রাম্পও স্বাক্ষর করেছেন। এ অবস্থায় রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ ইউরোপীয় মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেনপন্থী রাজনীতিকদের সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের চুক্তি মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়নে সহায়তা করতে পারে।
চুক্তির বিনিময়ে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পাবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চেয়েছে বিবিসি। ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও চুক্তির বিস্তারিত শর্ত স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখবে তারা। দেশটির এক মুখপাত্র বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সংগত শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলবে।


















