ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:০৯ অপরাহ্ন

ব্যাংকিং খাতকে দক্ষ, উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে: সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে ব্যাংকে নতুন জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে বলেও মন্তব্য করেন  অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার চিন্তা সঠিক নয়। ব্যাংকিং খাতকে দক্ষ, উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সিএমজেএফ আয়োজিত ব্যাংকিং খাতের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেন’র সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক ঝুঁকি নেওয়ার ব্যবসা। তাই ঝুঁকি কমানো নয়, বরং ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা করাই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে শুধু একীভূতকরণ যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার করতে হবে।

পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, একীভূতকরণের প্রক্রিয়া ঠিক হয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে ব্যাংক একীভূত করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিচালনাগত অদক্ষতা কমানো।

তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে একটি ব্যাংক একীভূত হলে শাখা, জনবল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই ধরনের কাজের জন্য দুটি আলাদা কাঠামো রাখার প্রয়োজন থাকে না। ফলে শাখা ও জনবল সমন্বয়ের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

তবে বাস্তবে একীভূত হওয়ার পর সেই কাঠামোগত সমন্বয় কতটা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। মাহবুবুর রহমানের বলেন, যদি একীভূত ব্যাংকগুলোর শাখা ও জনবল কাঠামো আগের মতোই থাকে, তাহলে একীভূতকরণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন কঠিন হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে শুধু নাম বা মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন করলেই হবে না। এর মাধ্যমে বাস্তবিক অর্থে কী ধরনের সমন্বয় হচ্ছে, কীভাবে ব্যয় কমছে এবং কীভাবে ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ছে এসব বিষয় দেখতে হবে।

মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ও দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় হলে একটি ব্যাংকের সক্ষমতা অন্য ব্যাংকের ঘাটতি পূরণে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু উভয় ব্যাংকই যদি দুর্বল অবস্থায় থাকে, তাহলে একীভূত হওয়ার পরও সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ব্যাড ব্যাংক’ ও ‘ব্যাড ব্যাংক’ একীভূত করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। কারণ একীভূত করার পর নতুন প্রতিষ্ঠানের সামনে পুরোনো খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাসহ একই ধরনের সমস্যাগুলোই থেকে যেতে পারে।

ব্যাংকিং খাত নাজুক

দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, অনেক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ও খেলাপি ঋণ সব ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের ওপরে রয়েছে এবং প্রকৃত চিত্র আরও বেশি হতে পারে। ২০০৮ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, বর্তমানে তা ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি।

সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান, খেলাপি ঋণের এই বড় বোঝা ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের নতুন মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ কার্যকরভাবে প্রয়োগ হলে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি প্রভিশন রাখতে হতে পারে, যা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলো ঋণ দিয়ে সুদ আয় করা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমছে, বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ছে। সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে পাওয়া আয় ব্যাংকের মুনাফায় সহায়তা করলেও এটি মূল ব্যাংকিং ব্যবসার বিকল্প নয়।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকের লাভজনকতার ক্ষেত্রে কম খরচে আমানত সংগ্রহ, বিশেষ করে কাসা (কস্ট অব ফান্ড) আমানত বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ব্যাংকের ব্যয় কমানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব ধরনের ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। বাড়িভাড়া, বেতন-ভাতা, বিমা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশই অনিবার্য। তাই নির্বিচারে কর্মী ছাঁটাই করে ব্যয় কমানোর পরিবর্তে প্রযুক্তি ও দক্ষতার ব্যবহার বাড়াতে হবে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ