ঢাকা, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ন

দেশীয় শিল্পে সংকটের ছায়া: কেন থমকে যাচ্ছে উৎপাদনের চাকা ডক্টর মো. সালাহ উদ্দিন

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দেশীয় শিল্প। শিল্প খাত শুধু উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ায় না, এটি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিল্প খাত এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ ব্যয়, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা এবং বাজারের দুর্বল চাহিদার কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (CMSME) খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।

শিল্প বন্ধের সাম্প্রতিক চিত্রও পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি বড় শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ছিল তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য শিল্প এবং বাকিগুলো ছিল পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানা বন্ধের পেছনে আর্থিক সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া, জ্বালানি সমস্যা এবং শ্রম পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

ক্ষুদ্র শিল্পে সংকট সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশের শিল্প কাঠামোর বড় অংশজুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই খাত দেশের স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বড় শিল্পের তুলনায় CMSME খাতের আর্থিক সক্ষমতা কম হওয়ায় বর্তমান সংকটের ধাক্কা তারা বেশি অনুভব করছে।

একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য কাঁচামালের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের সুদ বৃদ্ধি বা বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বেড়ে যাওয়া সরাসরি ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেক ছোট কারখানা এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, কেউ কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে, আবার কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ
শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন উৎপাদন ব্যয়। বাংলাদেশে শিল্পের একটি বড় অংশ কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ডলারের উচ্চমূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং এলসি খোলার জটিলতার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে বস্ত্র, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, প্লাস্টিক ও প্রকৌশল শিল্পে এর প্রভাব স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা অতিরিক্ত খরচ পুরোপুরি পণ্যের দামে যুক্ত করতে পারছেন না। ফলে লাভের পরিমাণ কমছে এবং ব্যবসার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

উচ্চ সুদহার ও অর্থায়নের সংকট
শিল্প খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে ঋণের সুদহার বেড়েছে এবং ব্যবসার মূলধন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিছুটা সক্ষমতার মাধ্যমে এই চাপ মোকাবিলা করতে পারলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বড় বাধা। কারণ CMSME উদ্যোক্তাদের অনেকেই সীমিত মূলধন নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

জ্বালানি সংকট: উৎপাদনের বড় বাধা
শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশেষ করে সিমেন্ট, ইস্পাত, সিরামিক ও বস্ত্রের মতো জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

ইরান সংকট ও বৈশ্বিক ঝুঁকি
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান ও পশ্চিমা শক্তির উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় সেখানে অস্থিরতা বাড়লে তেলের দাম, জাহাজ পরিবহন ব্যয় এবং বীমা খরচ বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়। ক্ষুদ্র শিল্পগুলো এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে প্রভাব
শিল্প সংকটের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। গাজীপুরে দুটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১,৮০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে।
অন্যদিকে অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তও ধীর হয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা এখন সম্প্রসারণের চেয়ে টিকে থাকার কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

উত্তরণের পথ
দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (CMSME) জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং উদ্যোক্তাদের আধুনিক ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

একটি স্থিতিশীল শিল্পনীতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় শিল্প আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

গবেষক ও লেখক: ডক্টর মো. সালাহ উদ্দিন
রপ্তানি বাণিজ্য প্রধান, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পি এল সি

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ