ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন

গাজায় শিশুদের ওপর ইসরায়েলের পরিকল্পিত গণহত্যা: জাতিসংঘের তদন্ত

ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর পরিকল্পিত ও সুপরিকল্পিত আক্রমণ যে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল, তা উঠে এসেছে জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে। ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চল, বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন অব ইনকোয়ারির প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে এই তদন্ত চালানো হয়।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংগৃহীত প্রমাণাদি নির্দেশ করে যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং হত্যা করেছে। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরেও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর হামলা ও হত্যা অব্যাহত রেখেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজার মাতৃত্বকালীন ও নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোকে ইসরায়েল যেভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে, তা ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ভবিষ্যৎ এবং নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে সরাসরি বিপন্ন করেছে। এর ফলে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি এবং শিশুদের স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, গত বছর গাজায় ইসরায়েলের ত্রাণ অবরোধের কারণে শিশুরা অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছে এবং টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রকোপ বহুগুণ বেড়েছে।

শুধুমাত্র আক্রমণ বা গোলাবর্ষণই নয়, ফিলিস্তিনি শিশুদের ইসরায়েলি কারাগারে আটক রেখে অমানবিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল জাজিরার তথ্যচিত্র ‘বডিজ অফ এভিডেন্স’-এর অনুসন্ধানেও ইসরায়েলি সামরিক ও কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাক্তন এক শিশু বন্দি জানিয়েছেন, কারাবন্দি অবস্থায় তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ ও সেনাদের উপহাসের শিকার হতে হয়েছে। গত বছরের শেষ নাগাদ আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই কারাগারে বন্দি ছিল বলে ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল-প্যালেস্টাইন (ডিসিআইপি) তথ্য দিয়েছে।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। গত অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত আট মাসে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বাহিনী এতিমখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছে, যা শিশুদের মেধা ও সামাজিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ থেমে গেলেও ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষত রাতারাতি শুকাবে না। তিনি বলেন, ‌‘শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত ফিলিস্তিনি জাতির অস্তিত্ব এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।’

জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘মানহানিকর’ এবং ‘প্রহসন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলি মিশন। এক বিবৃতিতে ইসরায়েল দাবি করেছে, প্রতিবেদনটি হামাসের ‘বর্বর কৌশলগুলোকে’ উপেক্ষা করেছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের মে মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের মূল কারণ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের জন্য এই কমিশন গঠন করেছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনেও কমিশন গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিল, যেখানে ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনের চারটি শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সূত্র: আল-জাজিরা

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ