ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ন

ওয়ালটন ও ইউনাইটেড গ্রুপের ১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, গ্রেপ্তার ১০

বেসরকারি ব্যাংক ডাচ-বাংলায় থাকা ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে ব্যাংক জালিয়াতি চক্রের ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানা। তাঁরা ওয়ালটন ও ইউনাইটেড গ্রুপের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

পুলিশ বলছে, অভিনব কৌশলে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের স্বাক্ষর জাল করে তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা সরিয়ে নেওয়া পরিকল্পনা করে চক্রটি। ব্যাংকটির একজন কর্মকর্তা চক্রের অন্যতম সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে (ডিবিবিএল) থাকা ওয়ালটন গ্রুপের অ্যাকাউন্ট থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা আরটিজিএস ফর্মে ট্রান্সফারের একটি আবেদন আসে। টাকাটি এবি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ট্রান্সফারের আবেদন করা হয়। ডিবিবিএলের বসুন্ধরা শাখার ব্যবস্থাপকের কাছে ট্রান্সফারের আবেদনটি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওয়ালটন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ওয়ালটন থেকে ব্যাংক ব্যবস্থাপকে বলা হয় তাঁরা টাকা ট্রান্সফারের আবেদন করেননি। পরে ট্র্যান্সফারের আবেদনটি স্থগিত করায়।

এ বিষয়ে ওয়ালটন গ্রুপের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) ডিএমপির ভাটারা থানায় একটি অভিযোগ করা হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ভাটারা থানা-পুলিশ।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ডাচ বাংলা ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখার এসএমই সেলস টিম ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন (৩৫), ইয়াসিন আলী (৩৪), মাহবুব ইশতিয়াক ভূইয়া (৩৫), আনিছুর রহমান ওরফে সোহান (৪২), মো. দুলাল হোসাইন (৩৫), মো. আসলাম (৫৩), আব্দুর রাজ্জাক (৪৮), জাকির হোসেন (৪৪), মো. আনোয়ার হোসেন ভুইয়া (৫৬) ও মো. নজরুল ইসলাম (৫০)।

শুক্রবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আসাদুজ্জামান।

ডিসি আসাদুজ্জামান বলেন, গত ২৫ জানুয়ারি সকালে ইএফটির মাধ্যমে ডিবিবিএলের বসুন্ধরা শাখায় ওয়ালটন গ্রুপের অ্যাকাউন্ট থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিডি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির এবি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় থাকা অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফারের জন্য দুইটি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার ফরম জমা দেওয়া হয়। তখন বসুন্ধরা ডিবিবিএল ব্যাংকের ম্যানেজারের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে বিষয়টি তিনি ওয়ালটন গ্রুপকে জানান। তাৎক্ষণিক ওয়ালটনের কর্মকর্তারা ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি যাচাই করেন। পরে দেখা যায় আবেদনটি একটি প্রতারক চক্র করেছে। তখন তাঁরা টাকা ট্রান্সফারের আবেদনটি স্থগিত করেন।

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, চক্রের মূল হোতা জাকির হোসেন ডিবিবিএলে চাকরি করার সুবাদে ব্যাংকের সার্ভার থেকে ধনাঢ্য ও বড় ব্যবসায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করেন। যেই সব অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ বেশি তাঁদের ব্যাংক হিসাব থেকে স্বাক্ষর জাল করে আরটিজিএসের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফারের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার পর জাকির ইয়াসিন আলীকে স্বাক্ষর জালিয়াতির কাজ দেন।

পরে ইয়াসিন আলী স্বাক্ষর জাল করে মাহবুব ইশতিয়াক ভূইয়ার পরিচালিত অ্যাকাউন্ট এন আই করপোরেশন, বিডি লিমিটেড নামে এবি ব্যাংক লিমিটেড মতিঝিল শাখায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে জাল ব্যাংক দলিল তৈরি করে। পরে তাঁরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অন্য আসামিদের ঠিক করে।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গুলশান বিভাগের ডিসি বলেন, তাঁরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। দীর্ঘদিন দিন যাবৎ ডিবিবিএলের সার্ভার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করছিল তাঁরা। এই চক্রটির কার্যক্রম ব্যাংকের ভেতর থেকে শুরু হয়। এর বাইরে চক্রটির সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারে। গ্রেপ্তারের অভিযানের সময় দেখা যায়, চক্রের সদস্যরা ইউনাইটেড গ্রুপের অ্যাকাউন্ট থেকে ১২ কোটি টাকা ট্রান্সফারের চেষ্টা করছিল।

তিনি বলেন, চক্রটি দুইভাবে কাজ করে। চক্রটির এক অংশ যে গ্রুপ বা ব্যক্তির টাকা তাঁরা ট্রান্সফার করবে সেই নির্দিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে। অন্যদিকে চক্রটির আরেকটি অংশ যেই শাখায় টাকা ট্রান্সফারের আবেদনটি জমা দিবে সেই শাখার ব্যবস্থাপককে তাঁদের পক্ষে আনার জন্য বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ম্যানেজ করে।

চক্রটি এ রকম জালিয়াতি আরও করেছি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওয়ালটন গ্রুপের টাকাটা তাঁরা ট্রান্সফার করার চেষ্টা করছিল। গ্রেপ্তারের আগে চক্রটি ইউনাইটেড গ্রুপের থেকে ১২ কোটি টাকা ট্রান্সফারের চেষ্টা করছিল। এ ছাড়া এর আগে তাঁরা এ রকম ট্রান্সফার করেছি কি তা আমরা জানিনা। তাঁদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে।

এরা কি ধরনের অ্যাকাউন্ট কে টার্গেট করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরা মূলত বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক বা গ্রুপের অ্যাকাউন্টকে টার্গেট করে। এমন প্রতিষ্ঠানকে তাঁরা টার্গেট করে যেখান থেকে অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার হলে যেন তাড়াতাড়ি বুঝতে না পারে। কেননা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশাল অঙ্কের টাকা থাকে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ