ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১১ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে ৮৪ শতাংশ কর্মীই অনানুষ্ঠানিক খাতে, উদ্বেগ বিশ্বব্যাংকের

বাংলাদেশে কর্মরত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৮ জনই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। দেশে এ ধরনের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও প্রায় ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, দক্ষতার ঘাটতি এবং শ্রমবাজারের নানা প্রতিবন্ধকতায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। এতে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে মানসম্মত ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে কর্মীসংখ্যা কমিয়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদেরও অনেকে তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক চাকরি পাচ্ছেন না। এতে দেশের শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করছে এখন কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করতে হবে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর এ অনুপাত কমতে শুরু করবে। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের আধিক্য থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য দেশের হাতে সময় সীমিত। এ সময়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবছর অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১ দশমিক ১ শতাংশ। তবে জনমিতিক সুবিধার এ অবদান ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর বার্ষিক অবদান শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১১৭ কোটি কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আগামী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর তা কমতে শুরু করবে। অন্যদিকে, ২০৪৯ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি হতে পারে। বাংলাদেশেও ২০৫১ সালের মধ্যে প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। বিপরীতে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির মতে, জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানো, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ