ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ন

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়বে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে সংকটের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছর জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও ধাতুর বাজারে একাধিক সংকট একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি ও সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্যপণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের মজুত কমে গেছে। এ অবস্থায় ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।

বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, পণ্যবাজার একই সময়ে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অগ্রাধিকার।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ইতোমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলার দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে ১০টি দেশ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে এবং ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন নিয়েছে। কয়েকটি দেশ উভয় ধরনের সহায়তাই পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে এ দাম আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে হিসাবে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।

তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে নতুন বাধা, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে এ ঝুঁকি বাড়বে।

এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে।

খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। চলতি বছর সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। মূলত ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৯২ ডলারে দাঁড়াতে পারে। তবে তেলের চাহিদা কমার পূর্বাভাস থাকায় দাম আরও বেশি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে চাহিদা কমার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।

এদিকে, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদাও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে এ মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ