ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৪৫ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লায় ১৮ থানায় পুলিশের মেগা অভিযানে এক রাতে ৬২৪ কিশোর আটক

কুমিল্লা জেলা জুড়ে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের দৌরাত্ম্য রুখতে এক নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতভর জেলার ১৮টি থানা এলাকায় একযোগে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শিক্ষকের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম নিয়ে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পাশাপাশি ওই হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট তীব্র জনদাবির মুখে পুলিশ ধরপাকড়ের বিশাল এই অ্যাকশনে নেমে ৬২৪ জনকে আটক করে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জেলাজুড়ে উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণদের একাংশের মধ্যে ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক ও বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একযোগে ১৮টি থানা ও ডিবি পুলিশ এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। কুমিল্লা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং প্রতিটি থানা এলাকার বখাটে অধ্যুষিত ও চিহ্নিত আস্তানাগুলোতে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠে থেকে সরাসরি এ অভিযানের তদারকি করেন।

কোতোয়ালি থানায় সর্বোচ্চ আটক:

অভিযানের অংশ হিসেবে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। এই থানা এলাকা থেকে ৭৫ জনকে আটক করা হয়। এছাড়াও দাউদকান্দি থানা এলাকা থেকে ৫৯জন, বুড়িচং থানাযয় ৫০ জন, সদর দক্ষিণ থানায় ৪৬ জন মনোহরগঞ্জ থানায় ৪১ জন লাকসাম থানায় আটক করা হয় ৩৫ জনকে। বাকি ১২টি থানায় আটক ৩১৮ জনের যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।

দাউদকান্দি থানায় স্বজনদের হট্টগোল:

এদিকে, জেলাজুড়ে পুলিশের এই কঠোর অভিযানের মধ্যেই কুমিল্লার দাউদকান্দি থানায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত ৯টার দিকে কিশোর গ্যাং সন্দেহে আটক হওয়া সন্তানদের ছাড়িয়ে নিতে দাউদকান্দি থানায় এসে ভিড় জমান বিপুলসংখ্যক স্বজন। একপর্যায়ে তারা থানায় হট্টগোল ও ভাঙচুর চালিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এই সুযোগে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কয়েকজন আটক হওয়া কিশোর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুই মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, স্বজনদের একাংশ পুলিশ স্টেশনে তুমুল উত্তেজনা তৈরি করে জোরপূর্বক আটকদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ঘটনার পর থানা এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

সাঁড়াশি অভিযানের নেপথ্যে অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড:

মূলত গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংস হামলার শিকার হয়ে মর্মান্তিকভাবে খুন হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো কুমিল্লা ফুঁসে ওঠে এবং বখাটেদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনের প্রতি তীব্র জনদাবি ও ক্ষোভের জোয়ার তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের সেই তীব্র দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই জেলা পুলিশ এই মেগা সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে বাধ্য হয়।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এই ধরনের জিরো টলারেন্স অভিযান আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, সমাজ থেকে কিশোর গ্যাংয়ের অপসংস্কৃতি দূর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আটককৃতদের বিষয়ে কোনো পূর্ব অপরাধের রেকর্ড বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও স্ক্রিনিং শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ