জাপানের পূর্বাঞ্চলে নজিরবিহীন ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী টোকিওর পার্শ্ববর্তী চিবা প্রিফেকচার। সেখানে কয়েকটি এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে লাখো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টিতে চিবা প্রিফেকচারের বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজট।
বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় চিবার এক-তৃতীয়াংশের বেশি পৌর এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘লেভেল ৫’ জারি করেছে জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সি। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত মে মাসে নতুন দুর্যোগ-সংক্রান্ত আবহাওয়া তথ্যসেবা চালুর পর বৃষ্টি ও ভূমিধসের জন্য এটিই প্রথম লেভেল ৫ সতর্কতা জারির ঘটনা। শুক্রবার সকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে সতর্কতা নামিয়ে আনা হয়। তবে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে ওপরের স্তরের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে অস্বাভাবিক মাত্রায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। চিবা ও আশপাশের এলাকায় আরও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

চিবার গভর্নর তোশিহিতো কুমাগাই পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, অতীতে অনেক দুর্যোগ মোকাবিলা করলেও এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা তার হয়নি। মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
প্রবল বৃষ্টিতে একপর্যায়ে চার লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিবা, ইবারাকি, সাইতামা ও গুনমা প্রিফেকচারে দুই শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। বাড়ি ফিরতে না পারা যাত্রীদের জন্য চিবা প্রিফেকচারাল সরকারি ভবনও খুলে দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মানুষ আশ্রয় নেন।
বৃষ্টির কারণে টোকিওর কাছের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। প্রায় সাত হাজার মানুষ সেখানে রাত কাটান। বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় অনেক যাত্রী বাড়ি ফিরতে পারেননি। শুক্রবার ফ্লাইট স্বাভাবিক রাখার কথা জানালেও জাপান এয়ারলাইনস কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে।
বন্যায় চিবার বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ইচিকাওয়ায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়কে এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সাকুরায় পানিতে আটকা পড়ে গাড়ির ভেতর ৬৬ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ইয়াচিওয়ায় বন্যাকবলিত সড়ক থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কাশিওয়ায় গাড়ির ভেতর আটকা পড়ে ৭০-এর কোঠায় থাকা এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া সড়কে পড়ে গিয়ে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা অন্তত আটজনে দাঁড়িয়েছে।
অতিবৃষ্টিতে চিবা ও টোকিওর বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। জেআর ইস্ট জানিয়েছে, শুক্রবার কেইয়ো, কুরুরি ও উচিবো লাইনসহ কয়েকটি রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। কিছু এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচলও স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চিবার চুও ওয়ার্ডে বৃহস্পতিবার রাতে মাত্র এক ঘণ্টায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সাকুরায় তিন ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৮৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার, যা ওই এলাকার সর্বোচ্চ রেকর্ড। কিছু এলাকায় ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি হোল্ডিংসের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে চিবা প্রিফেকচারের প্রায় ৪৫ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
বাড়ি ফিরতে না পারা মানুষদের পরিবহনে সহায়তার জন্য চিবা প্রিফেকচার সরকার জাপানের সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সের সহায়তা চেয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো বন্যাকবলিত এলাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, একই সময়ে ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কায় বেশির ভাগ এলাকায় স্কুল ও সরকারি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে জাপান, ফিলিপাইন ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ঝড় আঘাত হানায় ওই অঞ্চলে দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে আঘাত হানা ডলফিনের প্রভাবে কয়েক হাজার ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, গাছপালা উপড়ে পড়া এবং ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটে। পরে ঝড়টি চীনের পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হলে দেশটির কর্তৃপক্ষ ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।


















