ঢাকা, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৫৪ অপরাহ্ন

আগে টিকা নেওয়া শিশুরা বিশেষ টিকা নিতে পারবে

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। ক্রমেই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ২০ দিনে সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা ১০৩ হলো। এ সময়ের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৮১২ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবশেষ ৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। চার জনের মধ্যে টাঙ্গাইলে ২ এবং ঢাকায় ২ জন। এদিকে, আমাদের রাজশাহী ও কুষ্টিয়া প্রতিনিধির দেওয়া তথ্যে আরও ৫ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রাজশাহীতে ৩ জন এবং ২ জন কুষ্টিয়ায়। বর্তমানে ৯৪৭ জন শিশু দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন। তবে নমুনা পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৪২ শিশুর শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

দেশে হামের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আজ রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকা কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। গতকাল শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, রবিবার সকাল ৯টা থেকে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে। টিকার পাশাপাশি অসুস্থ শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একটি শিশুও যেন টিকার আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা হবে। যারা আগে নিয়মিত কর্মসূচিতে টিকা নিয়েছে, তারাও এই বিশেষ টিকা নিতে পারবে; এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তিনি দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।’ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রকোপ বিবেচনায় ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে এই কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো বরগুনা (বরগুনা পৌরসভা ও সদর), পাবনা (পাবনা পৌরসভা ও সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া), চাঁদপুর (চাঁদপুর পৌরসভা ও সদর, হাইমচর), কক্সবাজার (মহেশখালী, রামু), গাজীপুর (গাজীপুর সদর), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট), নেত্রকোনা (আটপাড়া), ময়মনসিংহ (ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা, শ্রীনগর), রাজশাহী (গোদাগাড়ী), বরিশাল (মেহেন্দীগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ), নওগাঁ (পোরশা), যশোর (যশোর পৌরসভা ও সদর), নাটোর (নাটোর সদর), মুন্সীগঞ্জ (মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, লৌহজং), মাদারীপুর (মাদারীপুর পৌরসভা ও সদর), ঢাকা (নবাবগঞ্জ), ঝালকাঠি (নলছিটি), শরীয়তপুর (জাজিরা)।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সবাই হামে আক্রান্ত নয়। আমরা প্রটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করছি।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, ইতিমধ্যে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধানদের সঙ্গে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের পদক্ষেপগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। প্রথমত, দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ, দেশে আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিতরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জনমনে অযথা আতঙ্ক কমাতে এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে জাতীয় পর্যায়ে যোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব বাচ্চার হামের টিকা নেওয়া আছে, তারা হামে আক্রান্ত হলেও তাদের জটিলতা কম হয় এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে যেসব শিশুর পুষ্টিহীনতা আছে অথবা অন্য অসুস্থতা আছে সেই সব শিশু হামে দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিলতা তৈরি হচ্ছে, ফলে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত শিশুর জন্মের পর বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। প্রথম সপ্তাহে এক ডোজ। চার সপ্তাহ পর এক ডোজ, আরও চার সপ্তাহ পর আরেক ডোজ দিতে হয়। ৯ মাস হলেই হাম ও রোবেলার এক ডোজ এবং ১৫ মাস হলে শেষ ডোজ টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। এর আগে পলিও, নিউমোনিয়া, টিটেনাস, হুপিং-কাশ, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিসের টিকা প্রদান করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে আছে কোভিড মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত, শহরের বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানে ফারাক। মাইগ্রেশন ও ‘টিকা না পাওয়া’ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি। ফলে একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বিলকিস সুলতানা ইত্তেফাককে বলেন, ‘জ্বর হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে র‌্যাশ দেখা দিলেই একজন শিশু চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ র‌্যাশ আসার সঙ্গে সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া শুরু হয়ে যায়। এ সময় বাচ্চা খেতে পারে না, ফলে প্রস্রাব কমে যায় এবং কিডনির সমস্যা দেখা দেয়, এটাও হামের একটা জটিলতা।’ জ্বর হলেই শিশুকে পানিজাতীয় খাবার বেশি বেশি খাওয়াতে হবে এবং কোনো ধরনের জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে আসতে হবে। বাচ্চাদের বুকের দুধ অবশ্যই খাওয়াতে হবে বলে জানান তিনি। শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানো পুষ্টিহীনতার একটা বড় কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ