ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ন

টেকসই নির্মাণে স্বল্প-কার্বন উপকরণ ব্যবহার অপরিহার্য: কর্মশালায় বক্তারা

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও দ্রুত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আবাসন ও অফিস নির্মাণ খাতে স্বল্প-কার্বন সামগ্রী বা উপকরণ ব্যবহার অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অবকাঠামো তৈরির নকশা থেকে শুরু করে ব্যবহার উপযোগী করার প্রত্যেক পর্যায়ে আগের উপকরণ পুনরায় ব্যবহার, স্বল্প-কার্বন সামগ্রীর ব্যবহার ও রিনিউয়েবল এনার্জি নিশ্চিতে জোর দিয়েছেন তারা।

রোববার (২৯ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সার্কুলারিটি ইন দ্য বিল্ট এনভায়রনমেন্ট’ শীর্ষক কর্মশালায় এ বিষয়ে দেশের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়। কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে টেকসই ও সম্পদ-দক্ষ নির্মাণ পদ্ধতি প্রচার এবং বাস্তবায়ন করা।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্মশালার আয়োজন করে; যার সহযোগিতা করেছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), জাতিসংঘ প্রকল্প সেবাগুলোর কার্যালয় (ইউএনওপিএস) ও জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি (ইউএন-হ্যাবিট্যাট)।
জার্মান ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত একটি বৃহৎ প্রকল্পের অধীনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ; এ প্রকল্পের লক্ষ্য টেকসই নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্মাণ পরিবেশের আমূল পরিবর্তন আনা।

এই কর্মশালায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু-সহনশীল নির্মাণ পদ্ধতি ত্বরান্বিত করতে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা আবর্তনশীল অর্থনীতির নীতিসমূহ প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। উন্নত বিশ্বে ‘সার্কুলারিটি’ বা আবর্তনশীল পদ্ধতির ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

কর্মশালায় এ প্রকল্পের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম বলেন, ‘নির্মাণ খাত বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যা আবাসন ও সরকারি অবকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এটি অন্যতম সম্পদ-নিবিড় একটি খাত এবং পরিবেশের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে’।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা সামনের দিনগুলোতে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা যদি গতানুগতিক পদ্ধতিতেই নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাই, তবে তা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে এবং বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেবে’।

বাংলাদেশে এখনও ভবিষ্যতের অনেক অবকাঠামো তৈরি হওয়া বাকি উল্লেখ করে তিনি একে একটি ‘অনন্য সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেন। বলেন, ‘আমাদের সামনে সুযোগ রয়েছে একটি টেকসই ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার। সার্কুলারিটি বা আবর্তনশীল পদ্ধতি আমাদের উপকরণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে, বর্জ্য কমাতে এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়াতে সাহায্য করবে’।

সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর সহায়তায় একটি ‘ন্যাশনাল গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন সিস্টেম’ তৈরি করা হচ্ছে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর তাদের রেট শিডিউলে স্বল্প-কার্বন সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে।
জার্মান দূতাবাসের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান উলরিখ ক্লেপমেন বলেন,’আপনারা জানেন যে আমরা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি এবং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য উৎপাদন এবং সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্মাণ খাত একটি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই নির্মাণ পরিবেশে ‘সার্কুলারিটি’ বা আবর্তনশীলতার দিকে অগ্রসর হওয়া কেবল পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তাই নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগও বটে’।

জার্মানি বেশ কিছুকাল ধরে এই পথেই চলছে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এবং আমরা শিখেছি যে আবর্তনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন—আমরা কীভাবে অবকাঠামোর নকশা তৈরি করি, কীভাবে নির্মাণ করি, কীভাবে ব্যবহার করি এবং কীভাবে আমাদের ভবনগুলোকে পুনরুৎপাদন বা রিসাইকেল করি, সেই পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আমরা দেখেছি যে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, সঠিক নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো নির্ধারণ করে এবং নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বেসরকারি ডেভেলপার ও একাডেমিয়া—সবার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা এমন একটি খাত তৈরি করতে পারি যা কেবল স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারীই নয়, বরং আরও বেশি স্থিতিস্থাপক এবং দক্ষ’।

ইউএনওপিএস কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ ও ভুটান) সুধীর মুরলিধরন বলেন, “পুনঃব্যবহার বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়—এটি আমাদের ঐতিহ্য। বহু প্রজন্ম ধরে মানুষ দেখিয়েছে কিভাবে উপকরণ সাবধানে পুনঃব্যবহার করা যায়। এখন প্রয়োজন এই মাইন্ডসেটকে আধুনিক নির্মাণে আনা। আমরা দ্রুত শহরায়ন করছি। ১৯৭০-৮০ সালের বহু ভবন এখন পুরনো হয়ে গেছে, যা বর্জ্য তৈরি করবে। যদি আমরা তা ঠিকভাবে ব্যবহার না করি, এটি বড় পরিবেশগত সমস্যা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা এটিকে সংকট নয়, সুযোগ হিসেবে দেখছি। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, পুনঃব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ, মানদণ্ড প্রণয়ন ও প্রদর্শন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।”

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার, , ইউএনওপিএসের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন এবং হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মহাপরি মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারসহ সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং গবেষকরা।

বক্তারা অবকাঠামো তৈরি যেন টেকসই ও স্থিতিস্থাপক হয় তা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন বলে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে তারা বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়নের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে ‘সার্কুলারিটি’ বা আবর্তনশীলতা একটি কৌশলগত পথ হিসেবে কাজ করতে পারে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে অবকাঠামোর নকশা পরিবর্তন হচ্ছে এবং কম সম্পদের ব্যবহার করে টেকসই নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে তার বিভিন্ন কেস স্টাডি তুলে ধরেন।
“বাংলাদেশের নির্মাণ পরিবেশে কীভাবে সার্কুলার ইকোনমি বা আবর্তনশীল অর্থনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়?” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনাও হয়; যেখানে রাজউক, পিকেএসএফসহ এ খাত সংশিষ্টরা অংশ নেন।

নির্মাণ খাতে স্বল্প-কার্বন উপাদানের সমন্বয়, গ্রিন বিল্ডিং বা পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং নির্মাণ খাতকে জাতীয় জলবায়ু প্রতিশ্রুতি (আগামী এনডিসি লক্ষ্যমাত্রাসহ) অনুযায়ী সাজানোর পরামর্শ তুলে ধরেন।
বিজনেস আই/এসডি

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ