ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

খালেদা জিয়াকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে

বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হলে বেগম খালেদা জিয়াকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের নাগরিক সমাজ। বক্তারা বলেন, খালেদা জিয়া একমাত্র নেত্রী যিনি মানুষের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভায় তারা এসব মন্তব্য করেন। স্মরণ সভায় বক্তৃতায় বেগম খালেদা জিয়ার একজন চিকিৎসক খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অবহেলা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অবহেলা করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। তার চিকিৎসায় অবহেলার সমস্ত প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে এই শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।

গতকাল শুক্রবার বেলা আড়াইটার পর পূর্বনির্ধারিত এই শোকসভা শুরু হয়। শোকসভায় সভাপতিত্ব করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনা করছেন আশরাফ কায়সার এবং কাজী জেসিন। সভাস্থলে তারেক রহমানের আগমনের পর বিকাল ৩টা ৫ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে এ শোকসভা শুরু হয়। শেষ হয় ৫টা ৩৯ মিনিটের দিকে। এতে শোকগাথা উপস্থাপন করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত এই নাগরিক শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলের সিনিয়র নেতারাও। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠানস্থলে দুপুরের পর থেকেই আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানে আসার জন্য আগে থেকেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় অতিথিদের জন্য। সেখানে আমন্ত্রণপত্র ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শোকসভায় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা মঞ্চে বক্তব্য দেননি। তবে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী নেতারা শোক বক্তব্য দিয়েছেন। শোকসভা ঘিরে নিরাপত্তায় ছিল সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। শোকসভাস্থলে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন বেগম খালেদা জিয়া। এর পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে জিয়া উদ্যানে দাফন করা হয়। লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, এই জনপদের মানুষ তাকে মনে রাখবে তার ত্যাগ, সততা, অত্যাচার সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতাসহ নানা গুণের কারণে। তার দেওয়া মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তাঁর দল এবং দেশ রক্ষা পাবে, অন্যথায় পাবে না। তার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।

ডেইলি নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির বলেছেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, যা দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে গুণটি আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তাঁর রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট, তখন আমি লক্ষ্য করেছি তিনি নিরন্তর ও বিনা ব্যতিক্রমে একজন রাজনীতিক হিসেবে নিজের ওপর ও তাঁর পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যে আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেসবের প্রতিক্রিয়ায় তিনি কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি। তিনি আরো বলেন, আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সহজ কথা হতে পারে। কিন্তু এই যে সংযম, পরিমিতিবোধ এবং আত্মমর্যাদা রাজনীতিতে অনেক অনুসারী থাকতে পারেন, অনেক মত ও পথদর্শন থাকতে পারে; কিন্তু যিনি যেই রাজনীতির, যেই সংস্কৃতিরই অনুসারী হন না কেন, এই বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণুতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। খালেদা জিয়ার জানাজার প্রসঙ্গে নুরুল কবির বলেন, সেদিন বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বিএনপির এক নেতা লাখ লাখ মানুষকে কথা দিয়েছিলেন যে তাদের রাজনীতি বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে। এই কথাটি রাখতে বিএনপিকে অনুরোধ করেন নুরুল কবির।

ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। আমি একজন স্বাধীন সাংবাদিক। সে হিসেবে আমার মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মাহফুজ আনাম বলেন, দেশকে ভালোবেসে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। জেল, গৃহবন্দি এত কিছুর পরও তিনি যখন ৭ আগস্ট মুক্ত হয়ে ভাষণ দিলেন, সেখানেও তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। এই যে উদারতা, সেটা যদি আমরা মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে আমরা জ্ঞানভিত্তিক দেশ গড়ে তুলতে পারব। খালেদা জিয়ার যে শেষ বাণীÑ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান, আমরা যেন সবাই এটিকে ধারণ করি,’ যোগ করেন এ সম্পাদক। বিকালে শোকসভা শুরু হয়, এতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।

আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়। মাহমুদুর রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি ভয়ের ও শঙ্কার বিষয়ও। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সব সময় তারেক রহমানকে তার পিতা ও মাতার সঙ্গে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন যেকোনো মানুষের জন্যই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুজন নেতা-নেত্রী জন্মেছেন, যাদের সমতুল্য হওয়া কঠিন। আর তারা যদি পিতা-মাতা হন, তাহলে সেই সন্তানদের জন্য দায়িত্ব আরো অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার উক্তি উদ্ধৃত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্তি’ আজ শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার সেই অবিস্মরণীয় পতাকা, সেই শক্তি ও স্বাধীনতার পতাকা তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন, আল্লাহ যেন তারেক রহমানকে এই ঐতিহাসিক পতাকা বহন করার শক্তি ও সামর্থ্য দান করেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাসে একমাত্র স্বামী-স্ত্রী, যারা সারা জীবন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তারা যে জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন, সেই একই জনপ্রিয়তা নিয়েই আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই পরিবার থেকে স্বামী ও স্ত্রী দুজনই পুরো জাতির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন এ রকম উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ ইউনিক ঘটনা, যা আমাদের মনে রাখা দরকার।

এরপর সভায় বক্তব্য রাখেন, লেখক ফাহাম আব্দুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, যায়যায়দিন-এর সম্পাদক শফিক রেহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ডিপিআইয়ের সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ, মনির হায়দার, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুর নবী খান সোহেল, জহির উদ্দিন স্বপনসহ সিনিয়র নেতারা। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়।

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ