দুই মাস বিরতির পর আবারও ট্রাকে করে ভর্তুকি মূল্যে তেল, চিনি ও ডাল বিক্রি শুরু করছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। গত রবিবার (১০ আগস্ট) থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির নিত্যপণ্য পেতে এবারও লাইনে মানুষের ভিড় বেড়েছে। এবারের লাইনে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, দাঁড়াচ্ছেন মধ্যবিত্তরাও। ঢাকা জেলার টিসিবির পণ্য বিক্রির কয়েকটি স্পটে এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে।
জানা গেছে, সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি’র) পণ্য বিক্রি কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো- স্বল্প আয়ের মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য টিসিবি পণ্য বিক্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে রাজধানীর আশেপাশের এলাকায় যা দেখা গেছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। অনেকেই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য কিনতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। আবার পূর্ব ঘোষিত স্থানে নির্ধারিত সময়ের পরে ট্রাক আসায় পণ্য কেনার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে যাচ্ছে। দুর্বল ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পণ্য কিনতে ব্যর্থ হন। নির্ধারিত স্থানে টিসিবির ট্রাক কখন আসবে জানেন না অনেকে। তারপরও সকাল থেকে রাস্তার ধারে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এতে পণ্য কিনতে যাওয়া মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হলেও তা সহ্য করছেন।
গত রবিবার থেকে টিসিবি ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও কুমিল্লা মহানগরীসহ বেশ কয়েকটি জেলার নির্দিষ্ট কিছু স্থানে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে। যা তার আগের দিন শনিবার (৯ আগস্ট) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।
টিসিবির উপ-পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন সই করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১০ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন (শুক্রবার ছাড়া) ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২৫টি, গাজীপুর মহানগরীতে ৬টি, কুমিল্লা মহানগরীতে ৩টি, ঢাকা জেলায় ৮টি, কুমিল্লা জেলায় ১২টি, ফরিদপুর জেলায় ৪টি, পটুয়াখালী জেলায় ৫টি ও বাগেরহাট জেলায় ৫টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে ১০ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১৯ দিন (শুক্রবার ছাড়া) টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে। প্রতিদিন একটি ট্রাক থেকে ৫০০ জন মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্যাদি (ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল) বিক্রয় কার্যক্রম চলছে। যেকোনও ভোক্তা ট্রাক থেকে এসব পণ্য কিনতে পারবেন বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় না হওয়ায় টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে দীর্ঘদিন স্থবিরতা চলেছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নবিত্তসহ মধ্যবিত্ত পরিবারেও টিসিবি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। রমজান ও কোরবানির ঈদের পর এই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় টিসিবির ট্রাকের সামনে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। প্রতিজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, দুই কেজি মসুর ডাল এবং এক কেজি চিনি কিনতে পারবেন। পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে- তেল প্রতিলিটার ১১৫ টাকা, মসুর ডাল প্রতিকেজি ৭০ টাকা এবং চিনি প্রতিকেজি ৮০ টাকা।

টিসিবি জানায়, ঢাকা মহানগরীতে ৬০টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ১০ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। এছাড়া চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরীতে একইভাবে ১০ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ লাখ পরিবারের কাছে স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় আছে ৫৪ লাখ স্মার্ট কার্ড। অর্থাৎ এই সংখ্যক পরিবার বর্তমানে টিসিবির পণ্য কিনতে পারছেন। মোট এক কোটি পরিবারের কাছে স্মার্ট কার্ড সরবরাহের কথা টিসিবির।
জানা গেছে, দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে টিসিবির পণ্য ক্রয়ের জন্য দরিদ্র এমনকি নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির পাশাপাশি এবার মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও ট্রাকের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজার থেকে সয়াবিন তেল, ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর না কিনে টিসিবির ট্রাকের লাইন থেকে কিনছেন তারা। উদ্দেশ্য কিছু টাকা সাশ্রয় করা। কিন্তু এই লাইন ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। আগে পাড়ায় মহল্লায় এসব লাইন শুরু হতো সকাল ৮টার পর, এখন মানুষ এই লাইনে দাঁড়ায় সকাল ৬টা থেকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকায় এ ঘটনা ঘটছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫নং ওয়ার্ডের কোনাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. শুক্কুর মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে শুরু হওয়ায় টিসিবির লাইনে পণ্য কেনার জন্য দাঁড়াই। কিন্তু ট্রাকের কাছাকাছি আসতেই শুনি পণ্য নেই। দুই দিন গিয়ে ফিরে এসেছি।’
খিলক্ষেত বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো টিসিবির ডিলার মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীর প্রতিনিধি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন ৫০০ মানুষের মাল আনি। লাইনে দাঁড়ায় ৭০০ জন। স্বাভাবিক নিয়মেই এই স্পট থেকে ২০০ মানুষ ফিরে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নাই। প্রতিদিন এ নিয়ে মানুষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদও করতে হচ্ছে।’
টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ূন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। তবে এবার বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য ডালের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। সামনে ডালের দাম কমলে টিসিবি যেখান থেকে কিনে এনে আবারও দাম কমিয়ে বিক্রি করবে।’
তিনি জানান, ভবিষ্যতে টিসিবির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা হবে। তখন বেশি মানুষ উপকৃত হবেন।
টিসিবি সংশ্লিষ্ট ডিলাররা জানিয়েছেন, রাজধানীর কালশী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও রামপুরায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ে মারধরেরও শিকার হয়েছেন ট্রাকের কর্মীরা। অতীতে রাজধানীর কালশীতে এক ট্রাকচালককে মেরে রক্তাক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, প্রতিটি ট্রাকে বরাদ্দ করা পণ্যের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিসিবির পণ্যের সরবরাহ ও ট্রাকের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। যদিও টিসিবির সক্ষমতা রাতারাতি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে। বাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তাহলে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্য ক্রয় করতে পারবে। টিসিবির পণ্য ক্রয়েও এর প্রভাব পড়বে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, ‘রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টিসিবির কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। আগামীতে এর পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে। আশা করছি বাজারে এর প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।’


















