“যুদ্ধই শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উপায়।” — আলবার্ট আইনস্টাইন
বিশ্বশান্তি আজ গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ৭৩ হাজার ৯১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ১৮ হাজার ৫৯২ জন শিশু। এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা।
গাজায় গণহত্যার অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) বিচারাধীন; আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ২১ নভেম্বর ২০২৪ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। গাজা ও ইউক্রেনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উভয় সংঘাতেই বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইরানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাও বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মিনাবের একটি বিদ্যালয়ে হামলায় শিশুসহ ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন। ব্যাপক প্রাণহানি আবারও দেখায়, নিরীহ মানুষের মৃত্যু কোনো সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের ‘Prepare’ কর্মসূচি নাগরিকদের জরুরি খাদ্য, পানি, ওষুধ ও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে বলেছে। ইউরোপীয় কমিশনের ২৬ মার্চ ২০২৫ ঘোষিত ‘Preparedness Union Strategy’ অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন বিজ্ঞানী সংগঠন Bulletin of the Atomic Scientists ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘Doomsday Clock’ মধ্যরাতের ৮৫ সেকেন্ড আগে নির্ধারণ করে। পারমাণবিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকির এই প্রতীকী সতর্কসংকেত আসন্ন বিশ্বযুদ্ধের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে সামরিক জোট ও পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতা, আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার সঙ্গে বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার উদ্বেগজনক সাদৃশ্য রয়েছে। আজও বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, জাতীয় নিরাপত্তা এখন সামরিক প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার হামলা, জ্বালানি সংকট, সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও অপরিহার্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, সিরামিক, জাহাজ, পাট, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানির মূল্য ও প্রবাসী শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে জ্বালানিবাজার অস্থির হতে পারে। সাম্প্রতিক ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার প্রভাবে বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল; পেট্রোলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপের অর্থনৈতিক দুর্বলতা রপ্তানি আয়কে এবং আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যয় বৃদ্ধি দেশের মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও সমান জরুরি। সহিংসতা, শ্রমিক অসন্তোষ, শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। এসব ঘটনায় আওয়ামীলীগের কোনো অংশ বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার ও শিল্পের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে স্থিতিশীল গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক শাসনের জন্য শক্তিশালী জাতীয় সংসদ, রাজনৈতিক সংলাপ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
নগরে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা, ফুটপাত দখল ও অপরিকল্পিত যানব্যবস্থাপনা জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও পর্যটনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি মাদক থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা, সুশিক্ষার প্রসার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পূর্বশর্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব কর্মসংস্থান ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিবার কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, সুশাসন ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ওপর।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রাজস্ব সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিকল্প আমদানি ও রপ্তানি বাজার নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য ও জ্বালানির কৌশলগত মজুত, বিকল্প আমদানি উৎস, ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ খাতের সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং শ্রমিক-মালিক সংলাপ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দেশীয় প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি নীতিনিষ্ঠ থাকতে হবে। বিশ্বশান্তির জন্য বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের স্বাধীন বিচার এবং কার্যকর কূটনীতি যেমন জরুরি, তেমনি দেশে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করাও অপরিহার্য।
বিশ্ব তৃতীয় মহাযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি এখনো আছে। তবে গাজা, ইউক্রেন ও ইরানের বিপর্যয় এবং বিভিন্ন দেশের জরুরি প্রস্তুতি সতর্ক করছে যে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের সম্মিলিত প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের মূল প্রশ্ন বিশ্বযুদ্ধ কতটা আসন্ন, তা নয়; বরং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় দেশ কতটা প্রস্তুত। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র এবং কার্যকর কূটনীতিকে তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি সংকটের পূর্বাভাসে নয়, সংকটের মধ্যেও সার্বভৌমত্ব, জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার সক্ষমতায় নিহিত।
মাহমুদুর রহমান সুমন
অর্থনৈতিক সহসম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)