পেশাদার ক্রিকেটের জমকালো দুনিয়া থেকে থমকে যাওয়া এক জীবন। ইনজুরি, সামাজিক বাধা আর ভাঙা স্বপ্নের ভিড়ে যিনি একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিলেন, আজ তিনিই দেশের নারী ক্রিকেটের অন্যতম এক আশার প্রতীক। বলছি আরিফা জাহান বীথির কথা। অসুস্থতা আর জীবনের নানা প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৃণমূলে নারী ক্রিকেট জাগিয়ে তোলা সেই বীথি এবার সরাসরি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। দেশের প্রথম নারী ক্রিকেট একাডেমির কারিগর এবার সামলাবেন রংপুর বিভাগের নারী ক্রিকেট দলের মূল কমান্ড।
আজ থেকে প্রায় ৯ বছর আগের ঘটনা। ২০১৭ সালে ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন লিগের একটি ম্যাচ চলাকালীন হঠাৎই নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করে বীথির। চিকিৎসকেরা জানান, নাকে গুরুতর ইনফেকশন হয়েছে; খেলা চালিয়ে গেলে বড় ধরনের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। বাধ্য হয়েই সেদিন ভালোবাসার বাইশ গজ ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। ২০০৬ সাল থেকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব কিংবা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমির মতো দলে খেলে বেড়ানো মেয়েটির জীবন যেন সেদিন হঠাৎই অন্ধকার হয়ে যায়। শুধু কি খেলা ছাড়ার কষ্ট? এর কিছুদিন পর পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ভেঙে যায় তার বিয়ের কথাবার্তাও। আর্থিক অস্বচ্ছলতা আর শত প্রতিকূলতা তখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল তাকে।
কিন্তু হার মানার পাত্রী ছিলেন না বীথি। খেলা ছেড়ে ঘরে বসে থাকার মানুষ তিনি নন। নিজের অসমাপ্ত স্বপ্ন আর ক্রিকেটপ্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে মাত্র দুই বছরের মাথায়, ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে গড়ে তোলেন ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—তৃণমূলের অদম্য নারীদের বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয় দলের উপযোগী করে গড়ে তোলা। শুরুর দিকে প্রায় আড়াইশ নারীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন তিনি। নিজে ভালো ক্রিকেটার হতে না পারলেও অন্যের ব্যাট-বলের লড়াইয়ে নিজের স্বপ্ন খুঁজতে শুরু করেন এই লড়াকু নারী।
ক্রিকেট একাডেমি চালানো যে কতটা কঠিন, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন বীথি। রক্ষণশীল সমাজ ও নানা সামাজিক বাধার মুখে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে তাকে। তবে কদম একচুলও পেছনে ফেলেননি। মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে তার এই মানবিক রূপ আরও বেশি আলো ছড়িয়েছিল করোনাকালের দিনে। মহামারির শুরুর দিকে সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের পাশাপাশি তিনি নেমে পড়েন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবায়। নিজের জমানো শেষ সম্বল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, রুবেল হোসেনসহ দেশের নামী তারকাদের দেওয়া সহায়তায় তিনি হাজার হাজার মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছেন চাল, ডাল, পুষ্টিকর খাবার ও হরলিক্স।
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এই ধারা এখানেই থামেনি। করোনাকালের পর তার একাডেমির নাম বদলে রাখা হয় ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’। গত সাত বছরে তার হাত ধরে শতাধিক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। গৃহহীন অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবা পেয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, গরিব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ সব জায়গায় নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন এই মানবিক নারী।
অবশেষে তার এই দীর্ঘ সাত বছরের ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের মূল্যায়ন করল দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবি। দেশের নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন এবং তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণে আট বিভাগে নতুন কোচিং স্টাফ নিয়োগ দিয়েছে বোর্ড। যার অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগের প্রধান কোচ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে আরিফা জাহান বীথিকে। তার এই নতুন যাত্রায় সহকারী কোচ হিসেবে থাকছেন মুর্শেদা খাতুন সোমা এবং ম্যানেজারের দায়িত্বে মনিকা আক্তার আশা।
বিসিবির এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত বীথি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার অনুভূতির কথা। তার ভাষায়, এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সাত বছরের সংগ্রাম আর কষ্টের ফল আজকের এই অবস্থান। বিভাগীয় প্রধান কোচের দায়িত্ব পাওয়া তার জন্য অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে রংপুর বিভাগের নাম উজ্জ্বল করার পাশাপাশি তৃণমূল থেকে নতুন প্রতিভাবান ক্রিকেটার তুলে আনতে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ক্রিকেট থেকে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া এক মেয়ের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আজ কেবল একটি সাফল্য নয়; বরং এটি শত শত নারীর জন্য হার না মানার এক অনন্য অনুপ্রেরণা।