সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার সময় চরম নিরাপত্তা ব্যর্থতার স্বাধীন তদন্ত এবং জবাবদিহির দাবিতে শনিবার (২৪ অক্টোবর) তেল আবিবের রাজপথে নেমে আসেন হাজারো ক্ষুব্ধ মানুষ। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সাধারণ মানুষের এই গণবিক্ষোভ নেতানিয়াহু সরকারের ওপর নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
তেল আবিবের উন্মুক্ত চত্বর ‘হোস্টেজেস স্কয়ারে’ এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে ‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামের একটি সংগঠন। তিন বছর আগে গাজায় বন্দি হওয়া ইসরায়েলিদের পরিবারগুলো মূলত এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছে। গাজায় চলমান যুদ্ধের আগে হামাসের হামলা ঠেকাতে সরকারের চরম ব্যর্থতার আনুষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এই প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে তারা। আয়োজকদের দাবি, শনিবারের এই সমাবেশে এক লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।
সমাবেশের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে অক্টোবর কাউন্সিল জানায়, “নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি দাবি এবং একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আমাদের তিন বছর ধরে চলা সংগ্রামের চূড়ান্ত কর্মসূচিটি আজ আয়োজিত হচ্ছে।” সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, শুধু তেল আবিব নয়, নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে ইসরায়েলের আরও বেশ কয়েকটি স্থানে প্রতিবাদকারীরা জড়ো হন।
হোস্টেজেস স্কয়ারের সমাবেশে ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-ডানপন্থি ‘ইয়াশার পার্টি’র নেতা গাদি আইজেনকোট এবং ‘ডেমোক্র্যাট’ পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান। সমাবেশে আইজেনকোট যোগ দিতে গেলে বিক্ষোভকারীরা তাকে বিপুল উচ্ছ্বাসে স্বাগত জানান। এ সময় ‘কে আসছেন? পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’ শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ডানপন্থি জোটের সঙ্গে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলের পার্লামেন্টে কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না।
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইরানে নতুন করে ইসরায়েল হামলা চালাবে কি না, তা এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকোট যদি ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তিনি তুলনামূলক কম আগ্রহী হবেন। তবে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতাসহ পররাষ্ট্রনীতির অন্যান্য অধিকাংশ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
আক্টোবর কাউন্সিলের প্রধান লক্ষ্য হলো, ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য দায়ী ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোট সরকার একটি ‘স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে তারা একটি ‘রাজনৈতিক কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার অর্ধেক সদস্য সরকার নিয়োগ করবে এবং বাকিদের নিয়োগ করবেন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা। তবে বিরোধী দলের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক কমিশন গঠনের চেষ্টা করলে তারা তা বয়কট করবেন।