পড়াশোনার উন্নত পরিবেশের দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলনরত হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আহ্বানে আয়োজিত দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিল শেষে মানুষ প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক স্কয়ারের ভাস্কর্যের ওপরে এবং চারপাশে জমায়েত হয়। ছবি: এএফপি
শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় চলতি সপ্তাহের বাকি সময় দেশটির সব হাইস্কুলের ক্লাস স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন হাইস্কুল অবরোধ করে বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একই দিন দেশটির বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে শিক্ষক নিয়োগ, দুপুরের খাবারের বিরতি দীর্ঘ করা এবং স্কুলের দৈনিক সময়সূচির দৈর্ঘ্য পরিবর্তন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। তবে আয়োজকদের হিসাবে শিক্ষার্থী ও কর্মী মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার হাইস্কুল অবরুদ্ধ ছিল অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল।
রাজধানী প্যারিসের একটি মিছিল থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নাতাশা বাটলার জানান, বিক্ষোভে ক্রমেই বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠী যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি খাতের কর্মী ও শিক্ষক ইউনিয়নের সদস্যরাও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বাটলার আরও জানান, অভিভাবক ও শিক্ষকরা শুধু সন্তানদের সমর্থন করতেই বিক্ষোভে যোগ দেননি, তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা বিক্ষোভে ঢুকে পড়তে পারে এবং পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করতে পারে।
মার্সেই, নঁত ও লিয়ঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামেন। এসব প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বেঁচে থাকো, নাকি পড়াশোনা করো।’ স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ঁ ও রেঁনে শহরে বিক্ষোভের কিছু পর্যায়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে।
স্ট্রাসবুর্গের সাম্প্রতিক হাইস্কুল স্নাতক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হুগো ভেটজেল বলেন, ‘যখন জবাব হিসেবে সহিংসতা আসে, তখন তার অর্থ হলো গণতন্ত্র আর কাজ করছে না। অভিজাতদের সঙ্গে আমাদের মধ্যে এত বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।’
সরকারের পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি
দুই সপ্তাহ আগে প্যারিসের সবচেয়ে দরিদ্র শহরতলিগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দ্রুত পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি সরকার বলছে, আন্দোলনটি এখন শহুরে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এ কারণে কয়েকটি সমাবেশে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
হাইস্কুলের ক্লাস বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, ‘একটি হাইস্কুল পুড়িয়ে দিলে হাইস্কুল ভবনগুলোর অবস্থা উন্নত হয় না।’ তিনি জানান, ক্লাস স্থগিতের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে ‘অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা স্কুলের অবস্থা নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের সমাধান করতে পারে।
লেকর্নু আরও নির্দেশ দিয়েছেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে মন্ত্রীদের পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার পুরোনো স্কুল ক্যাম্পাসগুলো মেরামতের বিষয়টিও পর্যালোচনা করবে। তবে এসব পদক্ষেপ সরকার কত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদক বাটলার বলেন, ‘ফ্রান্স ঋণে জর্জরিত; দেশটির প্রকৃত বাজেট সংকট রয়েছে। সরকারি সেবায় অর্থ দেওয়ার জন্য সেই টাকা আসবে কোথা থেকে?’
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ফরাসি বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ২১৫ জন কিশোর আহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৭১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাও।
সংঘর্ষে কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন
সোমবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসেতে হাইস্কুল শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিস্ফোরণে উড়ে যায়। সরকার জানিয়েছে, ওই ঘটনায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেছিল। ফরাসি সংবাদপত্র লা ভোয়া দ্য নোর জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় ওই কিশোর পুলিশের একটি গ্রেনেড তুলে নেওয়ার পর তার হাত এবং হাতের একটি অংশ উড়ে যায়।
ট্রাম্পের মন্তব্য
এদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তিনি ফ্রান্সের পরিস্থিতির জন্য ব্যাপক অভিবাসন ও মুসলিমদের দায়ী করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ফ্রান্সে যা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ব্যাপক অভিবাসনের ফল। এটি স্কুল নিয়ে নয়, এটি ইসলাম একটি সময়ের মহান দেশকে দখল করতে চাওয়ার বিষয়!’
এর আগে আগস্টে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসন্ন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ‘জিহাদি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। গত সপ্তাহে মিশিগানের প্রাইমারি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর মুসলিম প্রার্থী আবদুল এল-সাইদের প্রসঙ্গেই তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন বলে মনে করা হয়। অধিকারকর্মীদের দাবি, এ ধরনের বক্তব্য নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টায় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যকে আরও উসকে দিচ্ছে।