বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মোট বাজার মূলধনের (Market Capitalization) আনুমানিক ১৫% থেকে ১৭% প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি, মার্চেন্ট ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠান) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সাধারণ লেনদেনযোগ্য (Free-float) শেয়ার এবং দৈনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ভিন্ন।
১. পুঁজিবাজারে মূলধন ও লেনদেনের বিন্যাস:
মোট বাজার মূলধন: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (DSE) মোট মূলধনের প্রায় ৫০-৫৫% উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে সংরক্ষিত। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৫-১৭%, সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫-১৮% এবং বাকি অংশ বিদেশি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণে। ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারে অংশ: উদ্যোক্তা ও সরকারের অবরুদ্ধ শেয়ার বাদ দিয়ে কেবল বাজারে লেনদেনযোগ্য (Free-float) শেয়ার বিবেচনা করলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ দাঁড়ায় প্রায় ৩৮% থেকে ৪০%। দৈনিক লেনদেনে অংশগ্রহণ: দৈনিক মোট লেনদেনের (Turnover) প্রায় ৮০% থেকে ৯০% সম্পন্ন হয় সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দ্বারা। দৈনিক লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অবদান মাত্র ১০% থেকে ২০%-এর মধ্যে থাকে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য থাকলেও বাংলাদেশের বাজার মূলত খুচরা বিনিয়োগকারী বা ট্রেডার-নির্ভর। বাজারের অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা কমাতে এবং গভীরতা বাড়াতে বর্তমানে বিএসইসি (BSEC) কর্পোরেট প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুয়াইটি ফান্ডগুলোকে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পথে প্রধান বাধাসমূহ:
ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প বিনিয়োগের উচ্চ সুদ: ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের সুদের হার উচ্চ হওয়ায় (১১-১৩%+) প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলগুলো পুঁজিবাজারের বদলে বন্ড মার্কেটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাংক এক্সপোজার লিমিটের কড়াকড়ি: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মূলধনের নির্দিষ্ট সীমার (Exposure Limit) অতিরিক্ত বিনিয়োগে কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ থাকা। পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অনুপস্থিতি: উন্নত বাজারের মতো বাংলাদেশে সরকারি ও করপোরেট প্রভিডেন্ট, গ্র্যাচুয়াইটি ও পেনশন ফান্ডগুলোর ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগের কার্যকর বাধ্যবাধকতা বা উৎসাহ নেই।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুর্বলতা: সুশাসনের ঘাটতি এবং অতীতে নিয়মিত লভ্যাংশ না দিতে পারায় মিউচুয়াল ফান্ড খাতের ওপর বিনিয়োগকারীদের ট্রাস্ট ঘাটতি রয়ে গেছে। নীতিগত অস্থিরতা ও তারল্য ঝুঁকি: অতীতে ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম বিধিনিষেধ আরোপের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডগুলো মূলধন আটকে যাওয়ার ভয়ে থাকে। মানসম্পন্ন নতুন শেয়ারের (Good IPO) অভাব: বাজারে বহুজাতিক ও শক্ত মৌলভিত্তিসম্পন্ন নতুন কোম্পানির সরবরাহ কম।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন যেসব সুবিধা দেওয়া যেতে পারে: কর ছাড় ও রাজস্ব প্রণোদনা: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্সে (Capital Gain Tax) বিশেষ ছাড় এবং লভ্যাংশ আয়ের ওপর দ্বৈত কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এক্সপোজার লিমিট ক্রয় মূল্যভিত্তিক (Cost Price) করা: ব্যাংকিং খাতের শেয়ারবাজার এক্সপোজার হিসাব করার সময় বাজার মূল্যের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে ক্রয়মূল্য (Cost Price) বিবেচনা করা।
পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলককরণ: বেসরকারি ও সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন ৫-১০%) মিউচুয়াল ফান্ড বা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া। বিশেষ তারল্য সহায়তা (Refinance Facility): বাজার সহায়তায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কম সুদের স্পেশাল রিফাইন্যান্সিং ফান্ড বা তারল্য উইন্ডো চালুকরণ। হেজিং ও আধুনিক টুলস প্রবর্তন: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য ইনডেক্স ফিউচারস, অপশনস ও শর্ট-সেলিংয়ের আইনি কাঠামো প্রবর্তন করা, যা প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডকে বড় ধরনের ধস থেকে সুরক্ষা দেবে।
হেলাল ইউ চোধুরী সাবেক ফাইনান্সিয়াল এডভাইজর, পিএলসি।