ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা জেগে ওঠে। মিরপুর, উত্তরা কিংবা যাত্রাবাড়ী থেকে হাজারো মানুষ ছুটে যান কর্মস্থলের দিকে। কারও হাতে অফিসের ব্যাগ, কারও চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন। এই শহরই লাখো মানুষের জীবিকার ঠিকানা, দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু একই শহরের অন্য একটি চিত্রও আছে। ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘ যানজট, বাতাসে দূষণের চাপ, সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এবং দ্রুত হারিয়ে যাওয়া সবুজ।
একদিকে ঢাকা আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে, এই উন্নয়ন কি আমাদের বসবাসের জন্য আরও ভালো একটি শহর তৈরি করছে? আগামী দিনের ঢাকা কি শুধু প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট সিটি হবে, নাকি এমন একটি টেকসই নগরী হবে, যেখানে মানুষ স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থ পরিবেশে বসবাস করতে পারবে?
বর্তমান বিশ্বে একটি শহরের উন্নয়ন আর শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয় না। একটি আধুনিক নগরকে একই সঙ্গে হতে হয় প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং মানুষের জীবনকেন্দ্রিক। অর্থাৎ প্রকৃত স্মার্ট সিটি হলো সেই শহর, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিক সেবা সহজ করা হয়, আবার একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন নগর এলাকায় বসবাস করছে এবং আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান ও উন্নত সেবার সুযোগের কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অনেকাংশে নগরনির্ভর হবে।
এই বাস্তবতায় ঢাকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শহরটি নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
বায়ুদূষণ ঢাকার অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। শুষ্ক মৌসুমে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান প্রায়ই আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে যানজট, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত খোলা স্থানের অভাব নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। শহরের অনেক খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক স্থান হারিয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।
তবে ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বিশ্বের অনেক শহর দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরকেও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।
সিঙ্গাপুর এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সীমিত ভূমির দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রযুক্তি, সবুজায়ন এবং কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি আধুনিক শহরের মডেল তৈরি করেছে। “City in Nature” ধারণার মাধ্যমে তারা উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সেখানে হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহারের উপযোগী নগর পরিকল্পনা করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলও পুরোনো নগর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব শহরের উদাহরণ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের সমাধান আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ঢাকার জন্য প্রথম প্রয়োজন পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা। খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা তৈরি, গণপরিবহন উন্নয়ন, পথচারীবান্ধব সড়ক এবং পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মেট্রোরেল ঢাকার গণপরিবহনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তবে একটি প্রকৃত টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়তে হলে বাস, রেল, নৌপথসহ সব ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এছাড়া ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের প্রবণতা কমাতে হবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও অন্যান্য শহরকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত করা গেলে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে। একটি দেশের সব উন্নয়ন যদি একটি শহরকে কেন্দ্র করে হয়, তাহলে সেই শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্মার্ট ঢাকা মানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়। একটি শহরের প্রকৃত স্মার্টনেস নির্ভর করে তার নাগরিকদের জীবনমানের ওপর। যেখানে শিশু নিরাপদে খেলতে পারে, মানুষ নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে পারে, বয়স্করা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারেন এবং সবাই সহজে নাগরিক সেবা পেতে পারেন, সেটিই প্রকৃত স্মার্ট নগর।
আগামী দিনের ঢাকা তাই শুধু স্মার্ট হবে না, হতে হবে টেকসই। প্রযুক্তি আমাদের পথ দেখাবে, কিন্তু প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই নির্ধারণ করবে এই শহরের ভবিষ্যৎ।
ঢাকার সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে এমন একটি শহর গড়তে পারি, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও সবুজ পরিবেশ পাশাপাশি থাকবে। কারণ ভবিষ্যতের সফল শহর হবে সেই শহর, যেখানে শুধু ভবনের উচ্চতা নয়, মানুষের জীবনের মানই হবে উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি।
লেখক ও গবেষক: ড. মো. সালাহ উদ্দিন
রপ্তানি বাণিজ্য প্রধান, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি