বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা এবং বৈশ্বিক অন্তর্ভুক্তিমূলক পুঁজি আকর্ষণের লক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় ‘অরেঞ্জ ইকোনমি সামিট ২০২৬: ঢাকা’। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (IIX), এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (PRI)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সামিটে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।
সামিটে বাংলাদেশের জন্য অরেঞ্জ ক্লাইমেট ফান্ডের আওতায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দেশের অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেমের বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পুঁজিবাজারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার অরেঞ্জ ইকোনমি সামিট ২০২৬ ডিএসইতে আয়োজন করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জলবায়ু সহনশীলতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন, ডিএসই টেকসই অর্থায়ন, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, অরেঞ্জ অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক উপকরণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সামিটে অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সামিটে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (IIX)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক দুররীন শাহনাজ (Professor Durreen Shahnaz) । তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক বাজার গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, তৈরি পোশাক, কৃষি, জ্বালানি রূপান্তর ও আর্থিক সেবাখাতে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাস্তবায়নে পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধি জরুরি।
তিনি ‘অরেঞ্জ মুভমেন্ট’-কে অন্তর্ভুক্তিমূলক পুঁজিবাজার গঠনের একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ কাজ করছে। তিনি জানান, আইআইএক্স গত এক দশকে বাংলাদেশে ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং দেশের প্রথম অরেঞ্জ বন্ড ইস্যুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।
অধ্যাপক শাহনাজ আরও ঘোষণা করেন যে, আইআইএক্সের এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘অরেঞ্জ ক্লাইমেট ফান্ড’-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় অরেঞ্জ অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর সহযোগিতায় ‘বাংলাদেশে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম নির্মাণ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে বাংলাদেশকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির বিদ্যমান কাঠামোগত চাপ এবং ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, বন্ড ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল একটি উদ্ভাবনী অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আর্থিক খাতে এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ড. রহমান আরও বলেন, গ্রিন বন্ড, সোশ্যাল বন্ড এবং দেশের প্রথম অরেঞ্জ বন্ডের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে; এখন প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, বাজারভিত্তিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অরেঞ্জ ক্যাপিটাল বাজার গড়ে তোলা। পরবর্তীতে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (আইআইএক্স)-এর বাংলাদেশে অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড পার্টনারশিপস বিভাগের পরিচালক দেবাশীষ রায়ের (Debashish Roy) সঞ্চালনায় একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন আইআইএক্স-এর সিনিয়র ডিরেক্টর (রিসার্চ অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিলেশনস) প্রিয়াঙ্ক তিওয়ারি (Priyank Tiwari) এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এম. আশিকুর রহমান (Dr. Ashikur Rahman) ।
আলোচনায় বাংলাদেশে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে। তিনি উল্লেখ করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে টেকসই ও বৈচিত্র্যময় আর্থিক বাজার গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, অরেঞ্জ বন্ডের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণ জলবায়ু সহনশীলতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাজিদা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের প্রথম অরেঞ্জ জিরো কুপন বন্ড ইস্যুকে তিনি পুঁজিবাজারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অরেঞ্জ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি