দেশের জলবায়ু-সংকটাপন্ন অঞ্চলে টেকসই জ্বালানির সুযোগ বাড়াতে কী কী বাধা কাজ করছে, তা চিহ্নিত করতে কেয়ার বাংলাদেশ এবং আইডিই বাংলাদেশ-এর যৌথ আয়োজনে রাজধানীতে একটি জাতীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে । কর্মশালায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশগ্রহণ করেন। সুন্দরবন ও হাকালুকি হাওরের মতো পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সম্প্রসারণযোগ্য এবং আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমাধান নিয়ে এতে আলোচনা হয়। যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত নবপল্লব প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কেয়ার বাংলাদেশ -এর নেতৃত্বাধীন এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে সিএনআরএস, কর্ডেইড, সিথ্রিইআর -ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ডিএসকে , ফ্রেইন্ডশিপ, হিউম্যানিটি এন্ড ইঙ্কলুসন (এইচআই), আইডিই বাংলাদেশ এবং প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন।
কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে আইডিই বাংলাদেশ বাজারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে কাজ করছে—বিশেষ করে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। নবপল্লব প্রকল্প জীবিকা উন্নয়ন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের সমন্বিত মডেল বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে সৌর সেচ ব্যবস্থা, জীবিকাভিত্তিক সৌর প্রযুক্তি, বায়ো-ডাইজেস্টারসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে, যা একদিকে আয় সৃষ্টি করে, অন্যদিকে জ্বালানি দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে।
উদ্বোধনী পর্বে আইডিই বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর সামির করিম বলেন,“নবপল্লব প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা মাঠপর্যায়ে কোন উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা বুঝতে পারছি। জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একটি সহনশীল ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার, বেসরকারি খাত এবং কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
একই অধিবেশনে ব্রিটিশ হাইকমিশন ঢাকার ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট টিমের সদস্য ন্যাথানিয়েল স্মিথ বলেন,
“বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর কেবল পরিবেশগত অগ্রাধিকার নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি কৌশলগত পথ। নবপল্লব প্রকল্পের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে উদ্ভাবনী ও কমিউনিটি-নির্ভর সমাধানকে সহায়তা করছে, যা ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণযোগ্য।”
কর্মশালায় সুন্দরবন অঞ্চলের দীর্ঘ মাঠ-অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় পর্যায়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন থাকলেও বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে অর্থায়নের ঘাটতি, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়, সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্বলতা, নীতির বাস্তবায়ন জটিলতা এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ বাজারে কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মূলধন পাওয়া, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই ব্যবসা বজায় রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন,বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে প্রধান বাধা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং কাঠামোগত ও রাজনৈতিক অর্থনীতির জটিলতা, যা সবার জন্য সমান জ্বালানি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন, শক্তিশালী স্থানীয় বাজার এবং সম্প্রসারণযোগ্য সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী পর্বে নবপল্লব প্রকল্পের চিফ অব পার্টি সেলিনা শেলি খান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয়ের আহ্বান জানান।