ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশজুড়ে সক্রিয় থাকবেন ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্তত ১৭০ জন বিদেশি সাংবাদিক। ইতোমধ্যে বিদেশি সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ ঢাকায় পৌঁছেছেন। আরও অনেকে পথে রয়েছেন এবং কেউ কেউ ভোটের ঠিক আগের রাতেও দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মোট ৫৪২ জন প্রতিনিধি নিবন্ধন করেছেন। ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ তালিকায় রয়েছে ২৩টি দেশ ও ৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি। তাদের মধ্যে ৫১ জন স্বাধীন পর্যবেক্ষক এবং ১৭০ জন বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন।
ভিসা সংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে সূত্রগুলো বলছে, মোট ৩৮৯ জন পর্যবেক্ষক অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়া ১০২ জন কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে ভিসা গ্রহণ করেছেন এবং আরও ৫১ জনের ভিসা প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছে আনফ্রেল, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট, আইআরআই, ওআইসি, এনডিআই, আইসিএপিপি এবং ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসসহ মোট সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও পর্যবেক্ষক দল পাঠানো হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে পাকিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়া; মধ্যপ্রাচ্য থেকে জর্ডান, তুরস্ক ও ইরান; ইউরোপ থেকে জর্জিয়া ও রাশিয়া; পূর্ব এশিয়া থেকে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া; মধ্য এশিয়া থেকে কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তান এবং আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়া প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে।
উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আদ্দো দানকওয়া আকুফো-আদ্দো, ভুটানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাশি পেমা, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মেহমেত ভাকুর এরকুলের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় প্রতিনিধিদল, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড রিচার্ড নিউবি, মালয়েশিয়া নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান রামলান বিন হারুন এবং ইরান পার্লামেন্টের সদস্য বেহনাম সাঈদি।
স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তালিকায় রয়েছে ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন টিম এবং সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে ভোটের মাঠে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন বিশ্বের প্রভাবশালী বহু গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিবিসির যুগল পুরোহিত, রঘবেন্দ্র রাও, দেবাশিষ কুমার ও প্রভাত কুমার; এএফপির ফিলিপ আলফ্রয়, পিটার জেমস মার্টেল, জালিস আহমদ সৈয়দ, অরুণাভ সাইকিয়া, সাজাদ হুসাইন ওয়ানি ও আসমা; স্কাই নিউজের ভিনীত সাবরওয়াল ও নেভিল লাজারাস; রয়টার্সের কৃষ্ণ নারায়ণ দাস; সিএনএনের রাহুল মালহোত্রা; দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের ইয়িক ফেই ল্যাম এবং দ্য গার্ডিয়ানের হান্না আইভরি এলিস পিটারসেনসহ বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ অধিশাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এবারের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ থেকে ২২৩ জন, কমনওয়েলথ থেকে ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস থেকে ২৮ জন এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট থেকে ১২ জন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন।
বিশ্বব্যাপী নির্বাচন ও গণভোটের খবর ছড়িয়ে দিতে দেড় শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে ৪৮ জন এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা থেকে সাতজন সাংবাদিক রয়েছেন। পাশাপাশি বিবিসি নিউজ, রয়টার্স, এপি, এনএইচকে, ডয়েচে ভেলে এবং এবিসি অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিরাও নির্বাচন কাভার করবেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিদেশি অতিথিদের ভিসা প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেন—সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী বুধবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এই ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে। ১১ ফেব্রুয়ারির ওই ব্রিফিংয়ে নির্বাচন প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরবে ইসি।
তবে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী, বৈষম্যমূলক ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, ইসি বা সরকারের অর্থায়নে থাকা-খাওয়ার সুবিধা গ্রহণ করে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা কীভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন মূল্যায়ন করতে পারবেন।
এদিকে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতো সুযোগ-সুবিধা দাবি করেছে দেশীয় পর্যবেক্ষকরাও। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর জোট ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (ইওএস) জানিয়েছে, পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে দেশীয় পর্যবেক্ষকদের কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।