বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন শিল্পের পথিকৃৎ ও ওয়ালটন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ এস এম নজরুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় বুধবার ওয়ালটনের হেডকোয়ার্টার্স, করপোরেট অফিসসহ দেশব্যাপী ওয়ালটনের সার্ভিস সেন্টার, প্লাজা এবং পরিবেশক শোরুমগুলোতে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
মহৎপ্রাণ এই ব্যক্তি ২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাতে না-ফেরার দেশে চলে যান। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর নিজ গ্রাম গোসাই জোয়াইরের পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
কর্মজীবনে সফল ব্যক্তিত্ব আলহাজ এস এম নজরুল ইসলাম ১৯২৪ সালের ৭ মে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গোসাই জোয়াইর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম এস এম আতাহার আলী তালুকদার এবং মাতার নাম মোসাম্মৎ শামছুন নাহার।
প্রথমে তিনি পিতা এস এম আতাহার আলী তালুকদারের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত থাকলেও স্বাধীনতার পর আলাদাভাবে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হলেও সততা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সেসব প্রতিকূলতা তিনি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেন।
দেশের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ইলেকট্রনিক্স পণ্য পৌঁছে দিতে ১৯৭৭ সালে তিনি ‘রেজভী অ্যান্ড ব্রাদার্স’—সংক্ষেপে ‘আরবি গ্রুপ’—প্রতিষ্ঠা করেন। রেজভী তাঁর বড় ছেলের নাম। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের জনক তিনি। যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সাফল্য পেয়েছেন। সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবে সব মহলে তাঁর সুপরিচিতি ছিল।
পরবর্তীতে তিনি ছেলেদের সঙ্গে বৈঠক করে ব্র্যান্ডের নাম নির্ধারণ করেন ‘ওয়ালটন’। পারিবারিক বৈঠকে আরেকটি ব্র্যান্ডের নাম ঠিক হয় ‘মার্সেল’। তবে প্রথমে ওয়ালটন ব্র্যান্ডের নামেই যাত্রা শুরু হয় এবং আরবি গ্রুপের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘ওয়ালটন গ্রুপ’। এতে তাঁর মেধাবী সন্তানদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আগে যেখানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কথাটি অবহেলার চোখে দেখা হতো, একসময় সেটিই পরিণত হয় সম্মানের এক স্লোগানে।
এক সময় দেশে ওয়ালটন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। পণ্যের উচ্চমান গ্রাহকদের আস্থা জোগায়। পরবর্তীতে একই গ্রুপের আরেক ব্র্যান্ড ‘মার্সেল’-এর যাত্রা শুরু হয়। নজরুল ইসলামের দূরদর্শিতা ও সুযোগ্য পরিচালনায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ওয়ালটন পণ্যের সুনাম ও খ্যাতি আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে।
২০০৬ সালে গাজীপুরের চন্দ্রায় জায়গা কিনে ওয়ালটনের নিজস্ব কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হলে প্রথমে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সেসব বাধা অতিক্রম করে নিজেদের অর্থায়নেই কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। ২০০৮ সালে নিজস্ব কারখানায় ওয়ালটন ফ্রিজ উৎপাদন শুরু হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের পণ্য ও সেবার মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে ওয়ালটন। পর্যায়ক্রমে টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, কম্প্রেসার, লিফট, ফ্যান, সুইচ-সকেট, কেবলসহ শতাধিক ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে ফিনিশড গুডসের পাশাপাশি ৫০ হাজারেরও বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পোনেন্ট ও ম্যাটেরিয়ালস উৎপাদন ও বাজারজাত করছে ওয়ালটন।
ওয়ালটন শুধু দেশীয় বাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়ে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশে ওয়ালটন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছে।
‘সময় এখন বাংলাদেশের’ স্লোগান নিয়ে দেশের প্রথম মোবাইল ফোন কারখানার যাত্রা শুরু করে ওয়ালটন। পরবর্তীতে ল্যাপটপ উৎপাদনও শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে ওয়ালটন কারখানা কমপ্লেক্স দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং তৈরি হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি।
বর্তমানে বাংলাদেশে শিল্পায়নের একটি মডেল হয়ে উঠেছে ওয়ালটন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ওয়ালটন কারখানা পরিদর্শন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ ওয়ালটনের উদ্যোগকে প্রকৃত শিল্পায়নের উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি আলহাজ এস এম নজরুল ইসলাম বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলা সমবায় ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, টাঙ্গাইল জেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি, টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের পরিচালক এবং টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জমি বন্ধকি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি নিজ গ্রামে ‘এস এম নজরুল ইসলাম কারিগরি বিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। অসুস্থ ও দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ। গ্রামের দুস্থ, বৃদ্ধ ও নারীদের জন্য তিনি বয়স্কভাতা প্রকল্প চালু করেন।