জাহাজ রফতানিতে আবারও গতি ফিরেছে দেশের অন্যতম প্রধান জাহাজ নির্মাতা ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডে। চট্টগ্রামে নির্মিত ‘মায়া’, ‘এমি’ এবং ‘মুনা’ নামে তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফট আজ ২০ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মারওয়ান শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তিনটি জাহাজই সম্পূর্ণভাবে ইউএই-ভিত্তিক ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নির্মিত। এগুলো অফশোর সাপ্লাই, মালবাহী পরিবহন এবং সমুদ্রবাণিজ্যের বিভিন্ন কাজে ব্যবহারযোগ্য। হস্তান্তরের পর জাহাজগুলো আরব আমিরাতের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
ল্যান্ডিং ক্রাফট তিনটিরই দৈর্ঘ্য ৬৯ মিটার, প্রস্থ ১৬ মিটার এবং ড্রাফট ৩ মিটার। আন্তর্জাতিক ক্ল্যাসিফিকেশন সোসাইটি বুরো ভেরিতাসের মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত এবং ১০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম। প্রায় ৭০০ বর্গমিটার ক্লিয়ার ডেক স্পেস থাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ও বাল্ক কার্গো পরিবহনে উপযোগী।
জাহাজগুলোতে রয়েছে দুটি ইয়ানমার মূল ইঞ্জিন, ইলেকট্রো-হাইড্রোলিক র্যাম্প উইঞ্চ, ২৪ মিলিমিটার স্টিল ওয়্যার রোপ, উন্নত অ্যাঙ্করিং ও হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং ব্যবস্থা। নেভিগেশনের জন্য ইনস্টল করা হয়েছে সিমরাড এস৩০০৯ ইকো সাউন্ডার, ফুরুনো জিপি-৩৯ জিপিএস, নেভিট্রন এনটি-৮৮৮৬ অটোপাইলট, রাডার ও আন্তর্জাতিক মানের কমিউনিকেশন সরঞ্জাম।
এ নিয়ে চলতি বছর মোট ছয়টি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতে রফতানি করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। বছরের শুরুতে ‘রায়ান’ নামে একটি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং জুলাই মাসে ‘খালিদ’ ও ‘ঘায়া’ নামে দুটি টাগবোট রফতানি করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর এবার ৩৯তম জাহাজ রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান বার্তা২৪.কমকে বলেন, গত বছর মারওয়ান শিপিংয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের আটটি জাহাজ নির্মাণের বড় ক্রয়াদেশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘রায়ান’ নামে একটি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং ‘খালিদ’ ও ‘ঘায়া’ নামে দুটি টাগবোট ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই চুক্তির ধারাবাহিকতায় এবার আরও তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফট হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি জাহাজের চাহিদা আবারও বাড়ছে। তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফট হস্তান্তর আমাদের জন্য শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, দেশের পুরো জাহাজনির্মাণ শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) শহিদুল বাশার বার্তা২৪.কমকে বলেন, এ ধরনের প্রতিটি জাহাজ নির্মাণে বর্তমান বাজারদরে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭ থেকে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই তিনটি জাহাজের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আমাদের মজুরি বা ‘ওয়ার্কম্যানশিপ’ বাবদ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ২.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। এক বছরেরও কম সময়ে আমরা জাহাজগুলো নির্মাণ করে হস্তান্তরের উপযোগী করেছি।
২০১০ সালে প্রথম জাহাজ রফতানি শুরু করে ওয়েস্টার্ন মেরিন। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ১১টি দেশে ৩৩টি জাহাজ রফতানি করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০২০ সালের শুরুতে দুটি বাল্ক কেরিয়ার রফতানির পর মহামারিসহ নানা কারণে পরবর্তী চার বছর আর কোনো জাহাজ রফতানি করতে পারেনি তারা। ২০২৩ সালে মারওয়ান শিপিংয়ের কাছ থেকে আটটি জাহাজ নির্মাণের অর্ডার পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে রফতানি কার্যক্রমে গতি পায়।
ওয়েস্টার্ন মেরিন সূত্র জানায়, মারওয়ানের সঙ্গে করা চুক্তিতে মোট আটটি জাহাজ রয়েছে- দুটি টাগবোট, চারটি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং দুটি অয়েল ট্যাংকার। এর মধ্যে চারটি ল্যান্ডিং ক্রাফট ও দুটি টাগবোট চলতি বছরই রফতানি করা হচ্ছে। বাকি দুটি অয়েল ট্যাংকার ২০২৬ সালের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।
জাহাজ নির্মাণযাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১টি দেশে বিভিন্ন ধরনের ৩৬টি জাহাজ রফতানি করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন, যার বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক মারওয়ান শিপিংয়ের কাছে প্রথম জাহাজ রফতানি করা হয় ২০১৭ সালে।