বিগত ১৫ বছরে নানা অনিয়ম -দুর্নীতি হয়েছে দেশের ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতে। বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের অবস্থা নাজুক। পুঞ্জীভূত লোকসানে জর্জরিত। এদের বেশিরভাগই গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের যে ঋণ রয়েছে, তার বিপরীতে জামানতও খুবই কম। ফলে সেগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভবনা দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে ব্যাংক খাতের সংস্কারের উদ্যোগ হিসাবে সংকটে পড়া পাঁচ শরীয়াভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। নতুন ব্যাংকের জন্য নাম প্রস্তাব করা হয়েছে দুটি—‘ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক’ ও ‘সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক’। ব্যাংকটি পরিচালিত হবে বাণিজ্যিকভাবে ও পেশাদারির ভিত্তিতে। নতুন ব্যাংকটি প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন হবে। পরে পর্যায়ক্রমে মালিকানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হবে।
তালিকাভুক্ত নয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া আর শরীয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত হলে বাজারে কি ধরনের প্রভাব পড়বে এ নিয়ে বিজনেস আই বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ বিনিয়োগকারীরা তো আর টাকা ফেরত পাবে না। কিন্তু কোম্পানিগুলোর অবস্থা যেহেতু খারাপ তাই বন্ধ না করেও উপায় নেই।
তিনি বলেন, যারা কোম্পানিগুলোর এমন দুর্দশা করেছে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু চোররা পালিয়ে যায় আর শাস্তি হয় বিনিয়োগকারীদের।
শরীয়াভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূতীকরণের বিষয়ে শাকিল রিজভী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মার্জারের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা যুক্তিসঙ্গত। যারা ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা তাদের কারণেই আজকে এই দুর্দশা। তাই উদ্যোক্তাদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা দরকার। ব্যাংকগুলো মার্জারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিটি ব্যাংক প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে। তাই ফেসভ্যালুর বিবেচনায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। এছাড়া নতুন যে ব্যাংক গঠন হতে যাচ্ছে, এই ব্যাংক একসময় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এই ব্যাংকের শেয়ার ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কথা মাথায় রাখার পরামর্শ দেন ডিএসইর এই পরিচালক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এবং ঋণ খেলাপির মতো বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে। একারণে কোম্পানিগুলোর বিরদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের লাইসেন্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, এটা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইভাবে এসব কোম্পানির আমানতকারীরাও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ যখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং আমানতকারী এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে, তখন তো তারা কেউই কোম্পানিগুলোর বিষয়ে জানত না।
পুঁজিবাজারে ৫টি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হওয়ার বিষয়ে মো.আল-আমিন বলেন- ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও মানি লন্ডারিং, ঋণ-খেলাপির মতো গুরতর অভিযোগ রয়েছে। একারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাংকগুলো একীভূত করে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করা হবে। এখানেও বিনিয়োগকারী এবং আমানতকারী ক্ষতির মুখে পড়বে।
ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, যাদের এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ রয়েছে তারা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তারা তো কিছু পাবে না। এটা অবশ্যই বাজারেরে জন্য একটি নেগেটিভ ম্যাসেজ।
৫টি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শরীয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো ডিলিস্টেড হয়ে নতুন ব্যাংক গঠন করা হবে। এটাও বিনিয়োগকারীদের জন্য খারাপ হবে। এটার ফরমূলা সরকার ছাড়া কেউ জানে না।
বিজনেস আই/