যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধাবসান নিয়ে একটি রোডম্যাপ (পথনকশা) প্রচার করেছেন, যা অনুপাতে বন্দি-ভর্তি প্রক্রিয়া এবং গাজার প্রশাসন-পরিবর্তনসহ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইসরায়েল রোডম্যাপের সীমারেখায় সম্মত হয়েছে এবং হামাস সম্মত হলে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে সীমিত বন্দি-হস্তান্তর, হামাসের অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ ও ধীরে ধীরে গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন—এসব প্রতিপাদ্য রয়েছে; তবে পরিকল্পনার শর্তগুলোতে হামাসের পূর্ণ সম্মতি রয়েছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক তৎপরতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ দ্রুততর করা হয়েছে যাতে প্রস্তাবিত ধাপগুলো দ্রুত চূড়ান্ত করা যায়।
আজ (রোববার) কাতার, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে হামাসের রেসপন্সকে স্বাগত জানিয়েছে এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, সব বন্দির মুক্তি (জীবিত বা মৃত), ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব স্থানান্তরের তাত্ক্ষণিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে তড়িতাড়ি আলোচনার প্রয়োজন।
তবে যুদ্ধবিরতির আশাকে ঘিরে তৎপরতা বাড়লেও সামরিক সংঘর্ষ স্থগিত হয়নি। আলোচনার আগে ইসরায়েলি বিমান ও নিক্ষেপে গাজায় হুমকিস্বরূপ হামলা ও নিহতের খবর আসছে—এতে অনেকে হতাহত হয়েছেন; ফলে তাত্ক্ষণিক শান্তি-প্রক্রিয়া বাস্তবে আনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়ে গেছে। কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, সুরাহা তখনই টেকসই হবে যখন সকল পক্ষ মৌলিক শর্তাবলী গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্মতি দেবে।
রোডম্যাপটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তা সাময়িকভাবে গাজার মানুষের কষ্ট কিছুটা শমন করতে পারে এবং বন্দিদের মুক্তি বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। তবু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—বিশেষত অস্ত্রত্যাগ, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং সীমাহীন মনিটরিং—এগুলো বাস্তবে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রাম্পের রোডম্যাপ কূটনৈতিক আলোচনার নতুন দ্বার খুলেছে—এটির সফলতা নির্ভর করছে হামাসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, ইসরায়েলি বাস্তব সম্মতি ও মাঠস্তরের সহিংসতা কমানোর ওপর।
হোয়াইট হাউস এমন একটি ২০ দফা প্রস্তাব প্রকাশ করেছে, যা তারা বলছে—এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হতে পারে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আর ফিলিস্তিনি উপত্যকাটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
প্রস্তাবটি উভয় পক্ষ গ্রহণ করলে যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে। গাজায় আটক সকল বন্দি—জীবিত ও মৃত—৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদেরও মুক্তি দেওয়া হবে। গাজা উপত্যকা অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হবে ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক (টেকনোক্র্যাটিক) সরকার দ্বারা, যেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ইসরায়েল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। তবে হামাসের কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাওয়ি আল জাজিরাকে বলেছেন, তারা এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত শান্তি পরিকল্পনা পাননি।
গাজায় গণহত্যা বন্ধে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা
১. গাজাকে সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না।
২. গাজা পুনর্গঠন করা হবে গাজার জনগণের কল্যাণে, যারা দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
৩. উভয় পক্ষ প্রস্তাবে সম্মত হলে যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হবে। ইসরায়েলি বাহিনী বন্দি বিনিময়ের প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে। এ সময় সব সামরিক অভিযান, বোমাবর্ষণ ও গোলাবর্ষণ বন্ধ থাকবে, এবং শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকবে।
৪. ইসরায়েল প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে গ্রহণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব বন্দি (জীবিত ও মৃত) ফেরত দেওয়া হবে।
৫. সব বন্দি ফেরত দেওয়ার পর ইসরায়েল ২৫০ জন আজীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ও ১,৭০০ গাজাবাসীকে মুক্তি দেবে, যারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আটক হয়েছিলেন—এর মধ্যে সব নারী ও শিশুও থাকবে। প্রতিটি ইসরায়েলি বন্দির মৃতদেহ ফেরতের বিনিময়ে ইসরায়েল ১৫ জন মৃত ফিলিস্তিনির দেহ হস্তান্তর করবে।
৬. হামাসের যেসব সদস্য অস্ত্র ত্যাগ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হবে। যারা গাজা ছাড়তে চান, তাদের নিরাপদে তৃতীয় দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
৭. প্রস্তাব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে গাজায় পূর্ণমাত্রার মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। অন্তত জানুয়ারি ১৯, ২০২৫-এর মানবিক চুক্তি অনুযায়ী খাদ্য, ওষুধ, পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, হাসপাতাল ও বেকারি পুনর্গঠন, ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও রাস্তা খুলে দেওয়ার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে।
৮. জাতিসংঘ, রেড ক্রিসেন্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ পরিচালিত হবে, যাতে উভয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ না থাকে। রাফাহ সীমান্তও উন্মুক্ত থাকবে জানুয়ারি ১৯, ২০২৫-এর চুক্তির একই কাঠামোয়।
৯. গাজার প্রশাসন পরিচালিত হবে একটি অস্থায়ী টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি কমিটির মাধ্যমে, যারা জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করবে। এতে দক্ষ ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। তাদের তত্ত্বাবধান করবে “বোর্ড অব পিস” নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার চেয়ারম্যান হবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অন্য সদস্যদের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। এই বোর্ড গাজা পুনর্গঠনের অর্থায়ন ও কাঠামো নির্ধারণ করবে, যতদিন না পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের সংস্কার কর্মসূচি সম্পন্ন করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।
১০. গাজার অর্থনীতি পুনর্গঠনে ট্রাম্প একটি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা নেবেন। মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক শহর নির্মাণে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই পরিকল্পনা হবে। এতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
১১. একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা হবে।
১২. কেউ গাজা ছাড়তে বাধ্য হবেন না। যারা যেতে চান, তারা যেতে পারবেন এবং ইচ্ছা করলে ফিরে আসতেও পারবেন। জনগণকে গাজায় থেকেই উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানানো হবে।
১৩. হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী গাজার প্রশাসনে কোনোভাবেই অংশ নিতে পারবে না। সব সামরিক, সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। একটি আন্তর্জাতিকভাবে তদারকিকৃত নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া চালু হবে, যেখানে অস্ত্র বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করা হবে। অস্ত্র জমা দেওয়া সদস্যদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করা হবে।
১৪. আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলো গ্যারান্টি দেবে যে হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী তাদের দায়িত্ব পালন করবে এবং নতুন গাজা কোনো রাষ্ট্র বা জনগণের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না।
১৫. যুক্তরাষ্ট্র, আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ISF) গঠন করবে, যা গাজায় মোতায়েন হয়ে স্থানীয় পুলিশকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে। জর্ডান ও মিশরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। এই বাহিনী গাজা সীমান্ত নিরাপত্তায় ইসরায়েল ও মিশরের সঙ্গে সমন্বয় করবে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রবেশ রোধ এবং দ্রুত পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় পণ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।
১৬. ইসরায়েল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না। ISF গাজায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) ধাপে ধাপে সরে যাবে। তাদের প্রত্যাহার নির্ভর করবে নিরস্ত্রীকরণের মানদণ্ড, সময়সীমা ও শর্তাবলীর ওপর, যা যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে নির্ধারিত হবে। IDF ধীরে ধীরে দখলকৃত এলাকা ISF-এর কাছে হস্তান্তর করবে, যতক্ষণ না গাজা সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ হয়।
১৭. যদি হামাস এই প্রস্তাব বিলম্ব করে বা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে IDF কর্তৃক হস্তান্তরিত “সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চলগুলোতে” প্রস্তাবিত সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালু থাকবে।
১৮. ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ শুরু করা হবে, যাতে পারস্পরিক সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়।
১৯. গাজার পুনর্গঠন অগ্রসর হলে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কার কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করলে, তখন ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে—যা ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা।
২০. যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংলাপ শুরু করবে, যাতে তারা শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় একমত হতে পারে।